বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রী নারী, তাই বলে কিন্তু এই নয় যে বাংলাদেশের সব নারীই তাদের স্বাধীনতা এবং প্রাপ্য অধিকার উপভোগ করছে। এখনও দেশের অধিকাংশ নারী, শুধু নারী বলেই, অবহেলিত,অসম্মানিত, অত্যাচারিত, প্রতারিত, নির্যাতিত। নারীকে মূলত অবলা, অসহায়, অক্ষম, অশক্ত প্রাণি হিসেবে বিচার করা হয়। পুরুষতন্ত্র দেশ জুড়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। এমন সময় শুনছি মিরোনা খাতুন নামে বাংলাদেশ নেভির এক জাতীয় দলের খেলোয়াড় ঢাকা সিটি ফুটবল ক্লাবের প্রশিক্ষক হতে যাচ্ছেন। এই ফুটবল ক্লাবটি পুরুষদের। না, মিরোনার চেহারা দেখে কেউ তাঁকে প্রশিক্ষক বানায়নি। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের কোচিং কোর্সগুলো রীতিমত সম্পূর্ণ করে, নিজের যোগ্যতা বার বার প্রমাণ করে তবেই মিরোনা প্রশিক্ষক হওয়ার অনুজ্ঞা পত্র পেয়েছেন, যে অনুজ্ঞা পত্র বা অনুমতি পত্র ফুটবল ক্লাবটির আগের পুরুষ প্রশিক্ষকটিরও ছিল না। মিরোনা বেজায় খুশি। ইতিহাস সৃষ্টি করলেন পুরুষদের ফুটবল দলের প্রথম নারী-প্রশিক্ষক হয়ে। সাক্ষাতকারে বলেছেন, ‘এখন ওরা আমাকে মেনে নিলেই হয়’। ওরা মানে পুরুষেরা। পুরুষদের তো নারীকে গুরু মানার, দলপ্রধান মানার, শিক্ষক মানার, প্রশিক্ষক মানার, প্রভু মানার অভ্যেস নেই।

বাংলাদেশ একা নয়, বেশ কিছু দেশেই পুরুষদের ফুটবল, বাস্কেটবল এবং আরও বিভিন্ন খেলার দলের কোচ নারী। নারীরা সেনাবাহিনীর জেনারেল, এডমিরাল , ফাইটার পাইলট, প্লাটুন কমাণ্ডার , সুপ্রীম কোর্টের বিচারক, রাজ্যের গভর্নর, রাষ্ট্রের মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপ্রধান হতে পারেন, আর ছেলেদের ফুটবল দলের প্রশিক্ষক হতে পারবেন না? নারী নিয়ে সকলেরই অনীহা,অনিচ্ছে, অমনোযোগ, অনাগ্রহ, অভক্তি, অশ্রদ্ধা। তাই নারীকে পুরুষের চেয়ে বেশি পরিশ্রম করতে হয়, পুরুষের চেয়ে নারীকে যোগ্যতার প্রমাণ বেশি দিতে হয়। অনেক দেশে, এমন কী আমেরিকাতেও, নারীকে ফুটবল দলের প্রশিক্ষক হিসেবে অনেক পুরুষই পছন্দ করে না। নারীরা ভালো প্রশিক্ষক হতে পারলেও, যেন-তেন খেলোয়াড়দেরও দক্ষ খেলোয়াড় বানাতে পারলেও, কোথাও যেন অসন্তোষ থেকে যায়। পুরুষ-খেলোয়াড়দের অনেকেই শুধু খেলার কায়দা কানুন জানলেই সুখী নয়, ‘আমি পুরুষ-আমি শ্রেষ্ঠ’ –এই পৌরুষিক অনুভবকেও অন্তরে ধারণ করতে আগ্রহী, সে কারণে নারী-প্রশিক্ষক নয়, পুরুষ-প্রশিক্ষকের প্রয়োজন তাদের, যারা পৌরুষের পতাকা যত্র তত্র ওড়াতে ইন্ধন জোগাবে।

নারীকে এই সমাজ সবার আগে ‘শরীর’ হিসেবে ভাবতে শিখেছে। নারী -প্রশিক্ষকের শরীর নিয়ে বদভ্যেসবশতঃ খেলোয়াড়রা মেতে ওঠে। রূপসী হলে পুরুষ- খেলোয়াড়রা তাঁকে কামনা করে, কুৎসিত হলে ছ্যা ছ্যা করে। তাহলে কি নারীকে রূপসী হওয়াও চলবে না, কুৎসিত হওয়াও চলবে না?মাঝামাঝি কিছু একটা হতে হবে, তা না হলে মুশকিল! এত কিছুর চাপ তো পুরুষ-প্রশিক্ষকের ওপর নেই। তাদের তো প্রশিক্ষণে পারদর্শি হলেই চলে।

অস্বীকার করার উপায় নেই যে আমাদের সমাজ কট্টর পুরুষতান্ত্রিক। এই সমাজ নারীকে পুরুষের অধীন হিসেবে দেখতে অভ্যস্ত। নারী যৌনবস্তু, নারী দাসি, ক্রীতদাসি, নারী পতিতা, নারী অধঃস্তন কর্মচারী, নারী শিক্ষক হলেও বালিকাদের শিক্ষক, নারী ডাক্তার হলেও মহিলা রোগীদের ডাক্তার, নারী নিরীহ, দুর্বল, নারী মা ,বোন, স্ত্রী, প্রেমিকা, নারী কন্যা। নারী ধর্ষণের শিকার, ভায়োলেন্সের শিকার। নারী সম্পর্কে ধারণা অধিকাংশ পুরুষের এমনই। নারী যে সক্ষম, সমর্থ, নারী যে সফল, শক্তিময়ী, পুরুষ যে যে কাজ করতে পারে, তার সবই যে নারীও পারে, নারী যে একাই একশ—এ সম্পর্কে ধারণা মানুষের কম, অথবা ধারণা থাকলেও এ নিয়ে আলোচনা মোটেও ভালো লাগে না। পুরুষকে প্রভুর আসনে বসিয়ে এক কৃত্রিম আমোদ পেতে ভালোবাসে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ পুরুষদের শিখিয়েছে মেয়েদের আদেশ দিতে, উপদেশ দিতে, নিয়ন্ত্রণ করতে, মেয়েদের শিখিয়েছে ওইসব আদেশ উপদেশ মানতে, নিয়ন্ত্রণ মানতে, মুখ বুজে মানতে। মেয়েরা পুরুষদের আদেশ উপদেশ দেওয়ার যোগ্য নয়,নিয়ন্ত্রণ করার যোগ্য নয়—তাও বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে।মেয়েরা যোগ্য নয় কারণ বিশ্বাস করা হয় মেয়েরা পুরুষদের চেয়ে জানে কম, বোঝে কম, পুরুষদের তুলনায় মেয়েদের জ্ঞান কম, মেয়েদের বুদ্ধি কম, মেয়েদের আত্মবিশ্বাস নেই, মেয়েরা ভীতু, ভীরু, হীনমন্য। এমন কুশিক্ষা দিয়ে মগজধোলাই হওয়ার পর কী করে প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষেরা প্রশিক্ষক হিসেবে মেয়েদের মেনে নেবে?

অন্যান্য দেশে সমস্যা হলেও বাংলাদেশে, আশা করছি, নারী-প্রশিক্ষক নিয়ে খুব সমস্যা হবে না।এই জন্য সমস্যা হবে না, যে, মানুষ ইতিমধ্যে নারীকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মেনে নিয়েছে। শুধু মেনেই নেয়নি, প্রধানমন্ত্রীকে রীতিমত ভয় পায়। ভয়ে তাঁর সম্পর্কে কোনও কটু কথা উচ্চারণ তো করেই না, তাঁকে যে খুব সমীহ করে , শ্রদ্ধা করে, তা প্রমাণ করার জন্য তাঁর সামনে মুহুর্মুহু মাথা নোয়ায়। নারীকে নিয়ে হাসাহাসি করতে হবে, কুৎসিত ইঙ্গিত করতে হবে, রসের আলাপ করতে হবে, নারীকে ঠেলা গুঁতো দিতে হবে, নারীকে নোংরা গালি দিতে হবে – এই যে কতগুলো বদ জিনিস পুরুষেরা বিশ্বাস করে, বিশ্বাস করে বলেই চর্চা করতে করতে অভ্যেসে পরিণত করেছে , প্রধানমন্ত্রীর বেলায় সেই অভ্যেসটা তো কিছুটা হলেও দমন করে চলছে।

তাঁকে নিয়ে কোনরকম নোংরামো প্রধানমন্ত্রী পছন্দ করেন না, কোনওরকম নিন্দা সমালোচনা বরদাস্ত করেন না। আশা করলেই আশা পূর্ণ হয় না, তারপরও আশা করছি, প্রধানমন্ত্রী শুধু নিজের নয়, গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল নারীদের ওপর হওয়া পুরুষদের যাবতীয় পৌরুষিক নোংরামো বন্ধ করার চেষ্টা করবেন। যে নারী আজ পুরুষদের ফুটবল ক্লাবের প্রশিক্ষক হলেন, সেই মিরোনা খাতুনকে যেন শুধু নারী হওয়ার কারণে অপদস্থ হতে না হয়। পুরুষ-খেলোয়াড়দের নারী-প্রশিক্ষক যদি দীর্ঘদিন চাকরি টিকিয়ে রাখতে না পারেন, তাহলে হয়তো পুরুষ-খেলোয়াড়দের প্রশিক্ষকের দায়িত্ব আর যাকেই দেওয়া হোক, নারীকে দেওয়া হবে না। নারীর ক্ষমতায়নের সুযোগ নষ্ট হবে, নারীর সমানাধিকার অর্জন বাধাপ্রাপ্ত হবে, পুরুষের নারী-বিদ্বেষ নিয়ন্ত্রণের সব চেষ্টা ভণ্ডুল হবে।

এই বৈষম্যের সমাজে পুরুষকে যেহেতু পুরুষতান্ত্রিক হওয়ার অভ্যেস করানো হয়েছে, মগজধোলাই করানো হয়েছে নারীকে ইতর শ্রেণীর প্রাণী হিসেবে দেখার জন্য —তাই একটি সুস্থ সভ্য সমতার সমাজ তৈরির জন্য নারী – পুরুষ উভয়কেই উদ্যোগ নিতে হবে নারীকে যেন পুরুষদের দলনেত্রী পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। এভাবেই পুরুষের নারী-বিদ্বেষী মানসিকতার পরিবর্তন হবে । নারী শুধু পুরুষদের মা বোন স্ত্রী কন্যা নয়, নারী শুধু হুকুমের দাসী নয়, নারীর কাজ শুধু রান্নাবান্না আর সন্তান উৎপাদন নয়, সন্তান লালন পালন নয়, নারী নেত্রী, নারী শিক্ষক, নারী বিজ্ঞানী, নারী বৈমানিক, নারী গুরু, নারী উপদেষ্টা, নারী প্রশিক্ষক — নারীর আদেশ পুরুষদের মেনে চলতে হবে। নারী-বিরোধী তত্ত্ব যা মুখস্থ করেছে লোকে, তা হাতে-কলমে ভুল প্রমাণ করতে হবে।
সমাজের সর্বস্তরে নারীর বিচরণ চাই। নারীকে শুধু শ্রমিক নয়, মালিকও হতে হবে। প্রধানমন্ত্রী শুধু নিজের, নিজের পরিবার পরিজন আর কাছের লোকদের ক্ষমতায়নের কথা ভাবলে অমর হবেন না। অমর হতে হলে গোটা দেশের অবহেলিত অসম্মানিত অত্যাচারিত নারীর কথা ভাবতে হবে। দেশের সকল নারীকে শিক্ষিত এবং সফল করে তোলার পক্ষে, যোগ্য নারীদের যোগ্য সম্মান দেওয়ার পক্ষে, কর্মস্থলকে নারী-বিদ্বেষমুক্ত রাখার পক্ষে সরকার যদি উদ্যোগ না নেয়, তবে ব্যক্তির উদ্যোগে কি আর অসম্ভবকে সম্ভব করা যাবে? মিরোনাকে দিয়ে ইতিহাস সৃষ্টি হলো। এরকম শত শত মিরোনাকে দেখতে চাই যারা শুধু পুরুষ খেলোয়াড়দের দক্ষ খেলোয়াড় বানাবে না, যারা পুরুষের নারী-বিদ্বেষও দূর করবে, পুরুষকে মানুষ বানাবে।