আফ্রিকার কিছু অঞ্চলে বীভৎস সব প্রথা

আফ্রিকার কিছু অঞ্চলে এখনও বীভৎস সব প্রথা মানা হয়। মেয়েদের যোনি-কর্তন তো আছেই, যেন যৌনসুখ পেতে না পারে। আরেকটি হলো স্তন-নির্যাতন, যেন বড় হতে না পারে স্তন, যেন পুরুষেরা স্তন দেখে যৌন আকর্ষণ অনুভব করতে না পারে। আফ্রিকায় এসব মানা হয়, এ কোনও নতুন খবর নয় । এও আমরা জানি যে ইউরোপ আমেরিকায় বসেই আফ্রিকার অভিবাসীরা মেয়েদের যোনি-কর্তন করছে। তবে নতুন খবর হলো, যুক্তরাজ্যে এই মুহূর্তে অন্তত দশ বারোটি বালিকার শরীরে বীভৎস স্তন-নির্যাতন চলছে। লন্ডন, ইয়র্কশায়ার, এসেক্স, ওয়েস্ট মিডল্যান্ডস থেকে খবর এসেছে বালিকাদের স্তনে উত্তপ্ত পাথর দিয়ে ঘর্ষণ চলছে, যেন স্তনের কোষগুলো পুড়ে যায়, ভেঙ্গে যায়, যেন স্তনের স্বাভাবিক বৃদ্ধি রোধ হয়। প্রতি সপ্তাহে অথবা দু’সপ্তাহ অন্তর অন্তর স্তনের ওপর এই যন্ত্রণাময় নির্যাতন চলে। যুক্তরাজ্যের এক নারী উন্নয়ন সংগঠন থেকে জানানো হয়েছে, দশ বারোটি স্তন-নির্যাতনের ঘটনা নতুন, কিন্তু গুনে দেখলে ও দেশে কম করে হলেও আফ্রিকাজাত ১০০০ বালিকার ওপর স্তন-নির্যাতন করা হয়েছে।

মেয়েদের ওপর পুরুষ যেন যৌন নির্যাতন করতে না পারে, তার ব্যবস্থা নিতে মেয়েদের শরীরকে পঙ্গু বানানো হয়। স্তনকে যেভাবে শিল-নোড়ায় মশলা বাটার মতো বাটা হয়, সেভাবে স্তনের বিকাশ আর স্বাভাবিক স্তনের মতো হয় না। শারীরিক ক্ষতি তো বটেই, মেয়েদের মানসিক ক্ষতিও সীমাহীন। বালিকাদের স্তনের ওপর এই নৃশংস নির্যাতন তাদের মা নানিরাই করছে। মা নানিরা বিশ্বাস করছে, এতে বালিকারা অসভ্য ধর্ষকদের কবল থেকে রক্ষা পাবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ধর্ষকদের ধর্ষণ বন্ধ করার জন্য, বা মেয়েদের বিরুদ্ধে পুরুষদের নানা রকম যৌন হেনস্থা বন্ধ করার জন্য পুরুষদের শিক্ষা দেওয়ার কোনও ব্যবস্থা কোনও সমাজই কেন নেয় না, কেন মেয়েদের ওপরই চলে নিজেদের বাঁচানোর জন্য নানা রকম অদ্ভুত অস্বাভাবিক অপমানজনক ব্যবস্থা গ্রহণের চাপ। পুরুষ হাত দেবে, নজর দেবে, পুরুষ ঝাঁপিয়ে পড়বে, হামলা করবে, ধর্ষণ করবে – এরকম নানা আশংকা নিয়ে মেয়েদের ছোটবেলা থেকেই বাঁচতে হয়। তাই বয়ঃসন্ধিতে পৌঁছোলেই ওড়না পর, স্তন আড়াল কর, চুল ঢেকে রাখো, উরু ঢেকে রাখো, পা ঢেকে রাখো – শুভাকাংক্ষীদের এমন উপদেশ বর্ষণ মেয়েদের জীবনকে অতিষ্ট করে তোলে। কিন্তু রীতি মেনে চলতে হয় পুরুষের ভয়ে। মেয়েরা যে খাদ্য, পুরুষেরা যে খাদক, কৈশোরে পৌঁছোবার আগেই মেয়েদের তা জানিয়ে দেওয়া হয়। আশ্চর্য, সমাজে যাদের সঙ্গে মেয়েরা ঘনিষ্ট ভাবে বাস করে, তারাই নাকি মেয়েদের শত্রু, তারাই যৌন হেনস্থা কারী, তারাই ধর্ষক, তারাই খুনী। এই রকম সমাজ কি মানুষের জন্য সামান্যও ভালো? পুরুষের জন্যও এমন কোনও সমাজ আদৌ বাসযোগ্য হতো না, যদি তাদের সর্বদা তটস্থ থাকতে হতো যে তাদের শরীরের ওপর আক্রমণ চলবে, তাদের স্তনহীনতার ওপর হামলা হবে, তাদের লিংগের উপস্থিতিকে দুমড়ে মুচড়ে ফেলা হবে, ক্ষত বিক্ষত করা হবে! কেন মেয়েদের মতো স্তন তাদের বড় নয়, তাদের লিংগ কেন অদ্ভুত, তাদের অণ্ডকোষ কেন ঝুলে থাকে, তাদের কেন দাড়ি গোঁফ গজায় – এইসব কারণে যদি ঝাঁপিয়ে পড়তো তাদেরই সংগে বাস করা তাদেরই লোক, পুরুষেরা যাদের সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করে নিজেদের লোক বলে? এমনতরো সমাজকে নিশ্চয়ই পুরুষেরা বলতো, এ সমাজ বাসযোগ্য নয়। তাহলে মেয়েদের অবস্থাটা অনুমান করে পুরুষেরা বুঝুক, তারা যে সমাজ তৈরি করেছে, এই সমাজও মেয়েদের জন্য বাসযোগ্য নয় মোটেও।

আমি মানুষ হয়ে জন্মেছি। কেন আমাকে আমার শরীরের স্বাভাবিক অংগের জন্য লজ্জা পেতে হবে, ভয় পেতে হবে। কেন পুরুষের ভয়ে স্তনকে পিষে ফেলতে হবে, কেন শিশুকালেই যোনি কেটে ফেলতে হবে, যোনিমুখ সেলাই করে বন্ধ করে দিতে হবে, যেন কোনও যৌনসুখ না বুঝি, যেন স্বামীই সেলাইয়ের সুতো খুলে প্রথম ভোগ করে আমাকে। মেয়ের শরীর বলে শৈশব থেকেই কেন ভুগতে হবে আমাকে! সারাটা জীবনই তো মেয়ে হওয়ার মূল্য দিয়ে দিয়ে যেতে হয়! শরীরে চুল কেন, চুল ঢেকে রাখো, মুখ কেন, মুখ ঢেকে রাখো, স্তন কেন, স্তন ঢেকে রাখো, কোমর কেন, কোমর ঢেকে রাখো, নিতম্ব কেন, নিতম্ব ঢেকে রাখো, যোনি কেন,যোনি হেফাজত করো, উরু কেন, উরু ঢেকে রাখো, পা কেন, পা ঢাকো। মেয়েদের মাথার চুল থেকে পায়ের নখ অবধিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে নারীবিদ্বেষী সমাজ।

মেয়েদের স্তন উত্তপ্ত পাথর দিয়ে ডলে, ঘসে, পিষে যে স্থবির করে ফেলা হয়, এই প্রক্রিয়াকে ইংরেজিতে ‘ব্রেস্ট আয়রনিং’ বলা হয়। বাংলায় এর অনুবাদ, স্তন ইস্ত্রি করা। আমরা কাপড় ইস্ত্রি করি। এবার স্তনেরও যে ইস্ত্রি হয়, তা জানুক মানুষ। এত যে ধর্ষণ করে পুরুষ, তাদের পুরুষাংগকে কিন্তু শাস্তি স্বরূপ ইস্ত্রি করে গলিয়ে ফেলা হয় না। কিন্তু স্তন নিয়ে মেয়েরা কোনও অন্যায় না করলেও, পুরুষেরা স্তনের উপস্থিতি দেখে অন্যায় করে বলে মেয়েদের স্তনকে মেয়েরাই গলিয়ে ফেলছে, অনুপস্থিত করে ফেলছে। এ কিন্তু মেয়েদের সুবিধের জন্য নয়। বরং অন্য পুরুষের সুবিধের জন্য। শৈশব- কৈশোরে যদি একটি মেয়ে ধর্ষণ থেকে বা নানা রকম যৌন হেনস্থা থেকে বাঁচে, তাহলে যে পুরুষটি মেয়েটিকে বিয়ে করবে, সে একটি অনাঘ্রাতা শরীর পাবে, কুমারী শরীর পাবে, সে শরীরকে তাড়িয়ে তাড়িয়ে সে একা ভোগ করবে, এই হলো স্তন ইস্ত্রি করার এবং যোনিদ্বার বন্ধ করার, বা ভগাংকুর কেটে ফেলার রীতিগুলোর মূল উদ্দেশ্য। পুরুষকে যৌনানন্দ দেওয়াটাই আসল কাজ। একটি পুরুষের ভোগের জন্য শরীরকে অক্ষত রাখতে হবে মেয়েদের। সুতরাং অক্ষত রাখার প্রাচীন সব প্রথা এখনও বহাল আছে, আফ্রিকাতে তো আছেই, এশিয়াতেও আছে। আফ্রিকার, এশিয়ার লোকগুলো পৃথিবীর যে প্রান্তেই বাস করতে যায়, সেখানে সংগে করে নিয়ে যায় নিজেদের প্রথা, সে প্রথা যতই মানবতাবিরোধী হোক।

নারীবিদ্বেষ ভ্রমণ করছে এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে। নারীবিদ্বেষের বিশ্বায়ন চলছে। সভ্য দেশগুলোয় অসভ্য দেশের অসভ্যতা ঢুকে যাচ্ছে। অসভ্য দেশে কিন্তু সভ্য দেশের মানবাধিকার, নারীর সমানাধিকার, গণতন্ত্র, মত প্রকাশের স্বাধীনতা কিছুই ঢুকছে না। গণতন্ত্র বলে যা দাবি করা হয়, তা সত্যিকার গণতন্ত্র নয়। মানবাধিকার, নারীর সমানাধিকার ইত্যাদি সম্পর্কে মানুষকে ধারণাই দেওয়া হয় না। কেউ যদি ধারণা দিতে চায়, তাহলে নানা রকম আইনের প্যাঁচে তাকে ফেলে তার মত প্রকাশের অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়। প্রাচ্যের চিত্রটা এরকমই। পাশ্চাত্যের নারী পুরুষ মানবাধিকারের জন্য, নারীর সমান অধিকারের জন্য দীর্ঘ দীর্ঘ কাল সংগ্রাম করে যে সভ্য সমাজ নির্মাণ করেছে, সেই সমাজকে কলুষিত করছে যোনি কর্তন আর স্তন নির্যাতনের রীতি, সে সমাজকে বাক রুদ্ধ করে দিচ্ছে বোরখা নিকাবের আগমন।

পশ্চিমের বেশ কিছু মেয়ে অভিবাসীদের ওপর আকৃষ্ট হয়ে তাদের সঙ্গী হিসেবে বরণ করছে। এক সমাজে বাস করলে মেলা মেশা হয়, মেলা মেশা হলে ভালোবাসা জন্মায়। পশ্চিমের মেয়েরাও প্রাচ্যের পুরুষের সংস্পর্ষে এসে হিজাব বোরখা গায়ে চাপাচ্ছে। জানিনা কোনও একদিন হয়তো যুক্তি বুদ্ধি এমনই লোপ পাবে যে চূড়ান্ত নারী বিদ্বেষী যোনি কর্তনে বা স্তন নির্যাতনকেও ওরা সমর্থন করবে। বামপন্থীরা তো কবে থেকেই এই বলে উদারতা দেখাচ্ছে যে সব সম্প্রদায়ের সংস্কৃতিকেই সমান মর্যাদা দিতে হবে, এমনকী হিজাব বোরখার সংস্কৃতিকে, এমনকী যোনি কর্তনের সংস্কৃতিকে। আমরা কি এখনও স্বীকার করবো না যে সব সংস্কৃতি সমান মর্যাদা পাওয়ার যোগ্য নয়? একটি সংস্কৃতি নাচ গানের, আরেকটি সংস্কৃতি স্তন-নির্যাতনের, এই দুই সংস্কৃতি কি সমান মর্যাদা পাওয়ার যোগ্য? নারী বিরোধী সংস্কৃতিকে কিছু নারী বিরোধী লোক এখনও পালন করছে বলে সেই সংস্কৃতিকে মর্যাদা দেব কেন? বরং সেই সংস্কৃতি নিষিদ্ধ করার জন্য আন্দোলন করবো। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না অধিকাংশ সম্প্রদায়ের অধিকাংশ ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতিই নারী বিদ্বেষে ভরপুর। সভ্য হতে গেলে নারীর সমানাধিকারে আমাদের বিশ্বাস করতেই হবে, সভ্য হতে গেলে নারী বিরোধী সংস্কৃতিকে নিষিদ্ধ করা ছাড়া কোনও উপায় নেই।

আমাদের অঞ্চল সভ্য নয়

বিদেশে থাকবো না, দেশে আবেগ, দেশে ভালোবাসা, দেশে আন্তরিকতা, দেশে চোখের জল, দেশে সত্যিকার বন্ধুত্ব, দেশে দয়ামায়া — এসব বলে বলে বিদেশ ছাড়লাম। দেশে আমাকে পা রাখতে দিল না দুই নবাবিনী। দেশ যেন তারা বিইয়ে নিয়েছে অথবা গাঁটের পয়সায় কিনে নিয়েছে এমন ভাব। অগত্যা পাশের দেশ, দেশের মতো দেখতে দেশ, ভারতে বাস করতে শুরু করেছি। আমরা তো এক কালের ভারতই। ভাষা কালচার সব তো একই। কাঁটাতার বসিয়ে দিলেই কি মানুষকে মানুষ থেকে আলাদা করা যায়?

আমার আশেপাশের সাধারণ মানুষদের কেমন দেখছি এখানে? পারতপক্ষে সত্যি কথা কেউ বলে না। যেদিকেই তাকাই, কী করে কাকে ঠকাতে হবে, কী করে চুরি করতে হবে, সুযোগ পেলে ডাকাতি করতে হবে, কাকে ল্যাং মারতে হবে, কাকে ফাঁসাতে হবে — এই নিয়ে লোকের ভাবনা চিন্তা। ওপরে আবেগ দেখাচ্ছে , ভেতরে ছিটেফোঁটা নেই। আন্তরিকতার তুবড়ি ছোটাচ্ছে, অন্তরে বিষ। সকলেই ব্যস্ত নিজের আখের, আরাম আয়েশ, পয়সা কড়ি গোছাতে। চরম অসৎ আর নিষ্ঠুর হতে পারে এরাই। আমার চেনা ১০০ জনের মধ্যে অন্তত ৮০ জনের অবস্থা এরকমই। বাংলাদেশের হালও নিশ্চয়ই একই।

পুব এবং পশ্চিম সম্পর্কে, মানুষের, আমার মনে হয়, বরাবরই ভুল ধারণা। আসলে সততা, সরলতা, আবেগ, আন্তরিকতা, মানুষের জন্য মানুষের দয়ামায়া, স্নেহ মমতা এসব যদি কোথাও থাকে, তবে পাশ্চাত্যেই। ওখানকার শাসকদের কথা বলছি না। নাৎসিদের কথাও বলছি না। ওখানকার সাধারণ মানুষের কথা বলছি। ওরা এখনও নিঃস্বার্থ হতে পারে, এখনও মানুষের জন্য ভালোবাসাটা ওদের নিখুঁত, এখনও মানুষ মানুষের জন্য কাঁদে। ওদের মধ্যেও স্বার্থপর আছে, নিষ্ঠুর আছে, বর্ণবাদী আছে, প্রচুর আছে। কিন্তু দরিদ্রর জন্য, পশুপাখির জন্য, গাছপালার জন্য, ভালোবাসার মানুষের জন্য, আত্মীয় স্বজনের জন্য, বন্ধুদের জন্য ওরা যা করে, আমাদের অঞ্চলের লোকেরা তার কিছুই করে না।

সম্ভবত যত সভ্য হচ্ছে, তত পৃথিবীর ভালোর জন্য ভাবছে ওরা। সুইডেনের ১৪ বছরের মেয়ে গ্রেটা থানবার্গ ক্লাইমেট বাঁচাবার জন্য একা একাই ধনী দেশগুলোর বিরুদ্ধে লড়ছে। কঙ্গোর জঙ্গলে গরিলাদের বাঁচাবার জন্য ইউরোপ আমেরিকা থেকেই লোক যায়। কোথাও বন্যা হচ্ছে, কোথাও মানুষ না খেয়ে থাকছে, ব্যস রুখসাক কাঁধে চলে যাচ্ছে এশিয়া আফ্রিকায় । যুদ্ধ বন্ধ করার মিছিল সবচেয়ে বেশি ওখানেই বের হয়। সিরিয়া থেকে আসা লক্ষ লক্ষ শরণার্থীকে বরণ করে নিয়েছিল সাধারণ জার্মানরাই। সভ্য হয়েছে বলেই ওরা সৎ , সচেতন, সংবেদনশীল, সহিষ্ণু। শরণার্থীদের মধ্য থেকে কালপ্রিট বেরোচ্ছে, তারপরও শরণার্থীদের সেবাযত্ন করে যাচ্ছে পাশ্চাত্যের সভ্য ছেলেমেয়েই। একবার আফগানিস্তানের একটি লোককে সুইডেনের সরকার ডিপোর্ট করার পর, উড়োজাহাজ থেকে সেই লোকের ভবিষ্যতের কথা ভেবে কেঁদে কেটে তাকে সুইডেনের মাটিতে নামিয়েছিল এক সুইডিশ তরুণী। কে কার মানবাধিকারের জন্য এভাবে লড়ে? এসব প্রাচ্যে হয় না, হয় পাশ্চাত্যের দেশগুলোয় । অতীতে পাশ্চাত্যের ভূমিকা মন্দ ছিল, প্রাচ্যে এসে বিস্তর শোষণ করেছে। অতীতে ওরা সভ্য ছিল না। এখন, বিশেষ করে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর সভ্য হয়েছে বলেই দুনিয়ার তাবৎ মানুষের মঙ্গলের জন্য অসাধারণ মানবাধিকার সনদ লিখতে পেরেছে।

এখনও আমাদের অঞ্চল সভ্য নয় বলেই মানুষ স্বার্থপর, নিষ্ঠুর, দয়ামায়াহীন, বর্বর, কুটিল, কদাকার। সভ্যতা মানুষকে সুন্দর করে, মহান করে, বিরাট করে, বিশাল করে।

বিশ্ব হিজাব দিবস

বিশ্ব হিজাব দিবস

মেয়েদের নিয়ে ঝামেলাই বটে। ফেব্রুয়ারির এক তারিখে শুরু হচ্ছে বিশ্ব হিজাব দিবস। কোনও শরীরে কোনও কাপড়ের টুকরো পরার এবং না পরার স্বাধীনতা নিয়ে আন্দোলন সম্ভবত তখনই হয়, যখন শরীরটা মেয়েদের। আমি কোনওদিন পুরুষদের দেখিনি টুপি পরার জন্য বা কেফিয়ে বা ঘুটরা পরার জন্য আন্দোলন করতে, বা না পরার অধিকারের জন্য পথে নামতে। ইরানে প্রতিটি মেয়ের ওপর হিজাব চাপিয়ে দেওয়ার আইন যখন হচ্ছে, লক্ষ লক্ষ ইরানি মেয়ে পথে নেমেছিল হিজাব না পরার অধিকার চেয়ে। ইরানের ধর্মীয় শাসক মেয়েদের সেই অধিকার দেননি।

কিছু মেয়ে চায় হিজাব পরতে, তারা হিজাব পরে। মুশকিল হলো কিছু মেয়ে চায় না হিজাব পরতে, কিন্তু তাদেরও হিজাব পরতে বাধ্য করা হয় । হিজাব না পরলে তাদের শাস্তি পেতে হয়। এইতো কয়েক মাস আগে বেশ ক’জন ইরানি মেয়ে ইরানের ফুটপাতে, যেন সকলে দেখে এমন উঁচুতে দাঁড়িয়ে, জনতার চোখের সামনে, দিনের ঝকঝকে আলোয়, কোনও শাস্তির তোয়াক্কা না করে মাথার হিজাব খুলে, লাঠির আগায় হিজাব বেঁধে হাওয়ায় উড়িয়েছে । তারা যা বলতে চায়, তা হলো, যারা হিজাব পরে পরুক, কিন্তু আমরা পরতে চাইনা। আমরা হিজাব না পরার অধিকার চাই। হিজাব যেহেতু ধর্মীয় পোশাক, ধর্ম যেহেতু যার যার ব্যক্তিগত, তাই হিজাবকে ব্যক্তিগত ইচ্ছে অনিচ্ছের মধ্যে রাখাটাই যৌক্তিক।

মেয়েদের শরীরে হিজাব, নিকাব, বোরখা, আবায়া, ওড়না– নানা কিছু পরার জন্য চাপ সৃষ্টি করা হয়। রাষ্ট্র চাপ দেয়, নয়তো পরিবার দেয়, আত্মীয় স্বজন দেয়, পড়শি দেয়, নয়তো সমাজ দেয়। অধিকাংশ মেয়েই চাপের কাছে নতি স্বীকার করে। আমার ব্যক্তিগত মত — চাপ বন্ধ হোক, শাস্তি বন্ধ হোক, মগজ ধোলাই বন্ধ হোক, পোশাক পরার ব্যাপারে মেয়েদের সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া হোক। ইস্কুলে, কলেজে, পুলিশে, আর্মিতে, অফিসে, আদালতে যদি ইউনিফর্মের ব্যবস্থা থাকে, সে তো পুরুষ-নারী সবাইকেই মেনে চলতে হয়। কিন্তু তা ছাড়া ব্যক্তিগত জীবনে মেয়েদের পোশাক নিয়ে বেশি মাথা ঘামায় রক্ষণশীল পুরুষেরা, মোল্লা কাঠমোল্লারা। মেয়েদের পোশাক পছন্দ করার দায়িত্ব মেয়েদেরই দেওয়া হোক।

অনেক মেয়েই ধর্মীয় কারণে হিজাব পরতে ইচ্ছুক, তাদের হিজাব পরতে বাধা দিলে যেমন হিজাবি মেয়ের পাশে অসংখ্য মানুষ দাঁড়ায়, তেমনি যে মেয়েরা হিজাব পরতে অনিচ্ছুক, তাদের হিজাব না-পরায় বাধা দিলে মানুষ হিজাবে অনিচ্ছুক মেয়ের পাশে তেমন দাঁড়ায় না। এখানেই চরম বৈষম্য।

বিশ্ব হিজাব দিবসের শুরু কোনও মুসলিম দেশে নয়, বরং খ্রিস্টান সংখ্যাগরিষ্ঠদের দেশে, আমেরিকায়। আমেরিকায় হিজাবের বিরুদ্ধে কোনও আইন নেই , হিজাবি মেয়েদের হেনস্থা করার কোনও সামাজিক নীতিও নেই। আমেরিকা ইউরোপের রাস্তায় হিজাবের পক্ষে আন্দোলন করার অনুমতিও প্রতিবছর মুসলমানরা বিধর্মী সরকারের কাছ থেকে পাচ্ছে। বিশ্ব হিজাব দিবস যারা পালন করছে, তাদের মূল উদ্দেশ্য ধর্ম নয়, মূল উদ্দেশ্য রাজনীতি। ধর্ম যখন রাজনীতি হয়ে ওঠে, তখনই ধর্মের সব গুণাবলি নষ্ট হয়ে যায়। তখন ধর্ম আর ব্যক্তিগত বিশ্বাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, তখন ধর্ম হয়ে ওঠে রাজ্য দখলের, ক্ষমতা জয়ের, অন্যের অধিকার হননের, অন্যের মুন্ডু কতলের হাতিয়ার। ধর্মকে ধর্ম হিসেবেই থাকতে দেওয়া হোক, রাজনীতিতে যেন এর রূপান্তর না হয়। আমরা তো ইতিমধ্যেই দেখেছি জামাতে -ইসলামি, ইস্লামিক স্টেট, বজরং দল, বা শিব-সেনাদের অগণতান্ত্রিক এবং অমানবিক কীর্তিকলাপ।

এ কথা সকলেই জানি যে ইসলামিক প্রজাতন্ত্রে ইসলামি পোশাক পরার জন্য, মানুষকে, বিশেষ করে মেয়েদের, চাপ দেওয়া হয়। কিন্তু অবাক হই যখন দেখি বাংলাদেশের মতো গণপ্রজাতন্ত্রীতেও চলে সেই চাপ। সম্প্রতি ইস্কুলের পাঠ্যবইয়ে সালোয়ার কামিজ আর ওড়না পরা এক মেয়ের ছবি ছাপিয়ে লেখা হয়েছে, মেয়েদের জন্য উপযুক্ত পোশাক। ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে এই বলে, মেয়েদের শরীরে শারীরিক পরিবর্তনের কারণে মেয়েরা ঝুঁকে হাঁটে, তাই ওড়না পরে হাঁটলে সোজা হয়ে হাঁটতে পারবে। এরপর পাঠ্য বইয়ে হয়তো বোরখা পরা মেয়ের ছবির নিচে লেখা হবে, মেয়েদের উপযুক্ত পোশাক। বোরখা পরার পক্ষেও নানা রকম যুক্তি খাড়া করা হবে।

আমার প্রশ্ন হলো, শরীরের পরিবর্তন হলে সেটা নিয়ে লজ্জা পেতে হবে কেন? সেটাকে বাড়তি কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখতে হবে কেন? সবাই তো এই পরিবর্তনের কথা জানেই। কৈশোর থেকে তারুণ্যের পথে যাওয়ার সময় ছেলেদের গলার স্বরের পরিবর্তন ঘটে, সেই পরিবর্তনটা কি ওরা কিছু দিয়ে ঢেকে রাখে? ছেলেদের মুখে বুকে লোম গজায়, কী দিয়ে ঢাকা হয় ওসব? তাহলে মেয়েদের ঋতুস্রাবের ঘটনা গোপন রাখতে হয় কেন, মেয়েদের স্তনের ওপর কাপড়ের ওপর কাপড় চড়াতে হয় কেন? কেউ যেন না দেখে? কেউ যেন না বোঝে স্তন বলে কোনও বস্তু আছে কাপড়ের আড়ালে? ওড়নার উপস্থিতিই আসলে বলে দেয়, আছে, কিছু আছে। মেয়েরা ওড়না পরার কারণ তাহলে কি এই নয় যে, পুরুষ খারাপ, মেয়েদের বুকের দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থাকে পুরুষ , পুরুষ নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে জানে না, সভ্য কী করে হতে হয়, পুরুষ জানেনা? মানি বা না মানি, মেয়েরা ওড়না পরা মানেই কিন্তু পুরুষের অপমান। ওড়না না পরলে মেয়েদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে অসভ্য পুরুষ। কিছু লোক মনে করে, ঝাঁপিয়ে পড়বে। আসলে যারা ঝাঁপিয়ে পড়ার, তারা, মেয়েরা ওড়না পড়লেও ঝাঁপিয়ে পরে, না পড়লেও ঝাঁপিয়ে পড়ে। ওড়না ওদের বাধা দিতে পারে না। ওদের মানসিকতার বদল করার জন্য ওড়না নয়, ওড়নার চেয়ে বড় কিছুর প্রয়োজন। সুশিক্ষার প্রয়োজন।

যতদিন মেয়েরা ওড়না পরবে, ততদিন মেয়েরা যে পুরুষদের বিশ্বাস করে না, পুরুষরা যে অসভ্য– তা প্রমাণ হবে। সমাধান হলো, মেয়েদের ওড়না পরা বন্ধ করতে হবে, পুরুষের অসভ্য হওয়া বন্ধ করতে হবে। স্তন যে চর্বি পিণ্ড, প্রাকৃতিক এবং স্বাভাবিক শারীরিক জিনিস — এ সম্বন্ধে ছেলে মেয়ে কেউ অজ্ঞ নয়। তাহলে এ জিনিস দেখতে এবং দেখাতে এত অসুবিধে কেন? মেয়েদের শরীর বলেই হয়তো অসুবিধে। পুরুষেরও স্তন আছে, সেই স্তনে যখন চর্বি জমে, তখন তো সেগুলোকে ঢেকে রাখতে বলা হয় না! পুরুষের শরীর বলেই হয়তো হয় না। ঘটে বুদ্ধি থাকলে যে কেউ বুঝবে, ওড়না পরা বা না- পরার ব্যবস্থা সম্পূর্ণই নারী পুরুষের মধ্যে যে একটা কৃত্রিম সামাজিক পার্থক্য তৈরি করা হয়েছে, তার কারণে।

পছন্দ মতো পোশাক পরার অধিকার মেয়েদের দেওয়া হয় না। অথচ পুরুষদের পোশাক নিয়ে কেউ কিন্তু আপত্তি করে না। তাদের যে পোশাক পরার ইচ্ছে, সে পোশাকই পরছে। শুধু মেয়েদের বেলায় চারদিকে অদৃশ্য নীতি-পুলিশ বসানো হয়েছে। এই বৈষম্য দূর না করলে সমতার সমাজ কী করে তৈরি হবে? পোশাক বিষয় নয়, পোশাক কিন্তু বিষয়ও। পোশাক দেখেই খানিকটা ঠাহর করা যায়, সমাজে মেয়েদের অবস্থান কোথায় ।

ইস্কুলের গার্হস্থ বিজ্ঞান বইয়েও দেখলাম জ্ঞান দেওয়া হয়েছে , মেয়েদের কী রঙের পোশাক পরা উচিত, কী রঙের পোশাক পরা উচিত নয়। মোটা মেয়েদের হাল্কা রঙের পোশাক পরতে হবে, তা না হলে তাদের আরো মোটা দেখাবে। তার মানে মোটা দেখানো খারাপ! মোটা মেয়েদের আত্মবিশ্বাস ধুলোয় লুটিয়ে দেওয়া হয়েছে! অস্টম শ্রেণীর মেয়েদের শরীর নিয়ে, শরীরের গঠন নিয়ে, ভালো দেখাচ্ছে নাকি মন্দ দেখাচ্ছে তা নিয়ে গবেষণা করা হচ্ছে ইস্কুলের বইয়ে। তার চেয়ে কি সমাজ এবং পরিবারের বৈষম্য এবং সমতা বিষয়ে মেয়েদের জ্ঞান দেওয়া জরুরি নয়? মেয়েদের মানসিক বিকাশে সাহায্য করা জরুরি নয়? চারিত্রিক বৈশিষ্ট উজ্জ্বলতর করার জন্য প্রেরণা দেওয়া জরুরি নয়?

ইস্কুলের ছেলেদের কি গার্হস্থ্য বিজ্ঞান পড়ানো হয়? মেয়েদের জন্য এই বিজ্ঞান যতটা জরুরি, তার চেয়ে আসলে বেশি জরুরি ছেলেদের জন্য। ঘর সংসার মেয়েদের কাজ, ছেলেদের আছে বাইরের জগত — এই ধারণা যে ভুল তা বারবার প্রমাণ হয়েছে। এই ধারণা মেয়েদের বিরুদ্ধে চিরকাল বৈষম্যই তৈরি করেছে। শতাব্দির পর শতাব্দি মেয়েদের ঘর-বন্দি রেখেছে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ। এই সমাজকে চ্যালেঞ্জ করে মেয়েরা আজ ঘরের বাইরে, দেখিয়ে দিয়েছে যে কাজ পুরুষেরা করতে পারে, সে কাজ মেয়েরাও পারে। মেয়েরাও হতে পারে সফল চিকিৎসক, প্রকৌশলী, পদার্থবিদ, বিজ্ঞানী, বৈমানিক, মহাকাশচারী, হতে পারে শিক্ষক, চিন্তক, শিল্পী, সাহিত্যিক, রাজনীতিবিদ, অর্থনীতিবিদ, সমাজবিদ, হতে পারে শ্রমিক, ব্যবসায়ী, পুলিশ, মিলিটারি, মন্ত্রী, রাষ্ট্রপ্রধান। কিন্তু পুরুষ এখনও দেখাতে পারেনি, মেয়েরা যা পারে, তারাও তা পারে, তারাও ঘর সংসারের কাজ করতে পারে, সন্তান লালন পালন করতে পারে। সে কারণেই বলছি, মেয়েদের গার্হস্থ্য বিজ্ঞান যতটা পড়া উচিত, তার চেয়ে বেশি পড়া উচিত ছেলেদের। এই বিজ্ঞান সম্পর্কে মেয়েদের জ্ঞান থাকলেও, ছেলেদের প্রায় নেই বললেই চলে। মনে রাখতে হবে, সভ্য হতে চাইলে বৈষম্যের সমাজ নয়, সমতার সমাজ গড়ে তুলতে হবে, নারী- পুরুষের সমানাধিকার যতদিন না হবে, ততদিন সমাজ আর যাই হোক, সভ্য হবে না।

ডিয়ার শেখ হাসিনা

ডিয়ার শেখ হাসিনা,

আপনি রোহিঙ্গাদের দুঃখে দুঃখী। ওদের কষ্টের কথা শুনে আপনি কেঁদেছেন। যখন পৃথিবীর কোনও দেশই পৃথিবীর সবচেয়ে নির্যাতিত জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দিতে চাইছে না, তখন আপনি দিয়েছেন আশ্রয়। আপনার মতো মানবতাবাদী প্রধানমন্ত্রী আর কাউকে আপাতত দেখছি না। এই মুহূর্তে জার্মান চ্যান্সেলর আঙ্গেলা ম্যার্কেলের সঙ্গে হয়তো আপনার তুলনা চলে।

ভারতে ৪০ হাজার রোহিঙ্গা ঢুকেছে। ওদের সবাইকে বের করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভারত সরকার। পাকিস্তান নেবে না রোহিঙ্গাদের। ধনী মুসলিম দেশগুলোও নেবে না। মুসলিমদের জন্য যারা মাতম করে সেই দেশগুলোও মুখ ফিরিয়ে রেখেছে। মৌলবাদী দেশগুলো রোহিঙ্গাদের পক্ষে চেঁচামেচি করবে, কিন্তু দেশে জায়গা দেবে না। বাংলাদেশের মতো গরিব দেশকে শেষ অবধি এগিয়ে আসতে হয়েছে। লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে নাফ নদীতে ডুবে মরা বা আত্মহত্যা করা বা অনাহারে মরে যাওয়া থেকে বাঁচিয়েছেন আপনি। আপনাকে নোবেল পুরস্কার দেওয়ার কথা সংসদেও উঠেছে। আপনার জন্য গর্ব হয়। নোবেল পুরস্কার অবশ্য আমাকে তেমন মুগ্ধ করে না। অনেক অযোগ্য লোককে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। হেনরি কিসিঞ্জারের মতো অমানবিক, অশান্তিপ্রিয় লোককেও নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। আং সান সু চি’র মতো মানবাধিকারে বিশ্বাস না করা, মহা অশান্তিকে অশান্তি বলে স্বীকার না করা মহিলাকেও ‘নোবেল শান্তি পুরস্কার’ দেওয়া হয়েছে। পুরস্কারের উদ্দেশ্যে কোনও ভালো কাজ করা, আর পুরস্কারের কথা না ভেবে দুঃস্থ-দরিদ্র-দুর্গত মানুষের পাশে নিঃস্বার্থভাবে দাঁড়ানো— দুটো দু’জিনিস। একটি আসল, আরেকটি নকল। আমার বিশ্বাস আপনি পুরস্কারের আশায় নির্যাতিত মানুষের পাশে দাঁড়াননি। সত্যি বলতে কী, মানুষের ভালোবাসাই আপনার সবচেয়ে বড় পুরস্কার। পৃথিবীর সবচেয়ে নির্যাতিত নিরাশ্রয় মানুষের ভালোবাসা আপনি পেয়েছেন, নোবেল এখানে তুচ্ছ।

আপনি বলেছেন, ‘দেশের ১৬ কোটি মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়েছে। মিয়ানমার থেকে আসা সাত লাখ রোহিঙ্গাকেও বাংলাদেশ খাওয়াতে পারবে। বিপদে পড়ে আমাদের দেশে আসা দুই-পাঁচ-সাত লাখ মানুষকে খাবার দেওয়ার ক্ষমতা আমাদের আছে।’ এ কথা পৃথিবীর ধনী দেশগুলো এখন অবধি বলেনি, বলেছে দরিদ্র একটি দেশ। বিপদের সময় সাহায্যের হাত বাড়ানো ধনী দেশের পক্ষে সম্ভব এবং সবাই ধনী দেশের সহযোগিতা আশা করে। বাংলাদেশের মতো দরিদ্র দেশ আশার বাণী শুনিয়েছে বলেই প্রকাশ পেয়েছে দরিদ্র দেশটির মহানুভবতা।

আপনি বলেছেন, ‘আমরা মিয়ানমারের শরণার্থীদের পাশে রয়েছি এবং তাদের সব ধরনের সহযোগিতা দিয়ে যাবো, যতক্ষণ না পর্যন্ত তারা তাদের দেশে ফিরছে আমরা পাশে রয়েছি।’ এই কথাই বা আজকাল কে বলছে! রোহিঙ্গাদের মধ্যে অনেকে ইসলামী সন্ত্রাসী হওয়ার দিকে ঝুঁকছে। সুতরাং এদের বিশ্বাস করতে চাইছে না কেউ। এমনকি মুসলমানের জন্য তৈরি হওয়া দেশ পাকিস্তানও চাইছে না। রোহিঙ্গাদের জঙ্গি বানানোর উদ্দেশ্যে জঙ্গি সর্দারগুলো ওঁত পেতে আছে বাংলাদেশে। কিন্তু আপনি বলে দিয়েছেন, কোনও স্বার্থান্বেষী মহল যদি ফায়দা লোটার চেষ্টা করে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। সুতরাং বিচ্ছিন্নভাবে হলেও কেউ যেন এ ধরনের কোনও অপচেষ্টার সঙ্গে লিপ্ত না হন। ওদিকে এলাকার মানুষকে বলে দিয়েছেন আশ্রিত জনগণের সঙ্গে কোনও অমানবিক আচরণ যেন কেউ না করে। সত্যি তুলনা হয় না আপনার সহনশীলতার এবং মানবতার। যেখানে অন্যান্য দেশ রোহিঙ্গাদের দূর দূর করে তাড়াচ্ছে, সেখানে আপনি তাদের বুকে তুলে নিয়েছেন। মুসলিম দেশগুলো সাধারণত শরণার্থীদের আশ্রয় দেয় না। লাখ লাখ অসহায় আরব শরণার্থী আরব দেশগুলোর দরজা বন্ধ পেয়ে আশ্রয় নিয়েছে ইউরোপে। মুসলিম শরণার্থীদের আশ্রয় নিতে হয় অমুসলিম দেশে। অথচ একটি মুসলিম দেশের পক্ষ থেকে আপনি, শুধু আপনিই দেখিয়ে দিলেন মুসলিম দেশও মানবিক হতে পারে, মুসলিম দেশও লক্ষ লক্ষ নির্যাতিত মুসলিমকে আশ্রয় দিতে পারে।

যদিও আপনি বলেছেন মিয়ানমার যেন রোহিঙ্গাদের ফেরত নেয়, যেন রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দেয়, যেন নিরাপত্তা দেয়— আপনি হয়তো জানেন, যত চেষ্টাই করা হোক না কেন, মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ফেরত নেবে না, বাংলাদেশেই ওরা জীবনভর থেকে যাবে, বংশ বিস্তার করবে। বিশাল এক অদক্ষ অভাবী জনগোষ্ঠী চুরি ডাকাতি ছিনতাই করবে বা মাদক বিক্রি করবে অথবা জঙ্গিদের দলে নাম লেখাবে। এ ঘটনা আগেও ঘটেছে, এ ঘটনা আবারও ঘটবে।

আপনি বলেছেন, ১৯৭৫ সালে আপনাকে শরণার্থী হিসেবে বিদেশে থাকতে হয়েছে। তাই শরণার্থীদের দুঃখ আপনি বোঝেন। কিন্তু আমি বুঝি না, আমার দুঃখ আপনি বোঝেন না কেন, অথবা বুঝতে চাইছেন না কেন। আমাকে শরণার্থী বানিয়ে রেখেছেন আপনি। দীর্ঘ ২৪ বছর আমি এক দেশ থেকে আরেক দেশে ঘুরছি। নিজের দেশ থেকেও নেই। থেকেও নেই, কারণ আমার নিজের দেশে আমাকে ঢুকতে দিচ্ছেন না। আমার বই নিষিদ্ধ করে রেখেছেন, বই থেকেও নিষেধাজ্ঞা তুলে নিচ্ছেন না। আমি পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দিতে চেয়েছি আমার বোনকে, সেই কাগজেও আপনার আদেশে সই করছে না বিদেশের বাংলাদেশ দূতাবাস। মানুষ আর কত অপমান, আর কত নিষেধাজ্ঞা, আর কত অধিকারবঞ্চিত হতে পারে এক জীবনে! এক মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে আরেক মানুষের জন্য কাঁদছেন। যে উদার, সে সবার জন্য উদার। আপনি কেন সবার জন্য উদার হতে পারেন না? আমি তো কোনও দোষ করিনি, কাউকে খুন করিনি, কারও অনিষ্ট করিনি। আমি মানবতা আর মানবাধিকারের কথা বলছি দীর্ঘকাল। আমাকে কেন অস্পৃশ্য বানালেন? মানবতাকে কোন মাচায় রেখে আপনি আমার মুখের ওপর আমার দেশের দরজা বন্ধ করেন? যদি কারও বাকস্বাধীনতায় আপনি বিশ্বাস করেন এবং কারোটায় করেন না, তাহলে কিন্তু বাকস্বাধীনতা ব্যাপারটাতেই আপনি বিশ্বাস করেন না। মানুষের বাকস্বাধীনতায় বিশ্বাস না করলে কি গণতন্ত্রে বিশ্বাস করা যায়? যত যাই বলুন, যায় না।

রাজিব হায়দারের হত্যার প্রতিবাদ করেছিলেন আপনি। কিন্তু যখন জানলেন রাজিব নাস্তিক ছিল, চুপ করে গেলেন। দেশে একের পর এক নৃশংসভাবে খুন হলো মুক্তচিন্তায় বিশ্বাসী যুবকেরা। খুন হলো ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাসী প্রগতিশীল ব্লগারেরা। আপনি কারও মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেননি। বিদেশ থেকে আসা মুসলিমদের জন্য আপনার চোখে জল আসে, আর দেশের প্রগতিশীল প্রতিভাবান যুবকেরা খুন হয়ে গেলেও আপনি প্রতিবাদ করেন না। আপনি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেন না। আপনি ভয়াবহ সব খুনের বিরুদ্ধে একটি শব্দও উচ্চারণ করেন না।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি বার বার ভুলে যান যে আপনি আস্তিকের যতটা প্রধানমন্ত্রী, নাস্তিকের ততটাই প্রধানমন্ত্রী। ধনী-গরিব, নারী-পুরুষ, হিন্দু-মুসলিম, নাস্তিক-আস্তিক— সবার প্রতি আপনার সমান দায়িত্ব। সবাইকে আপনি সমান চোখে দেখবেন। সবার প্রতি আপনি সমান উদার হবেন। আর তা না হলে, আপনার মানবিকতা সত্যিকার মানবিকতা নয়। আপনার চোখের জলকেও লোকে একদিন বলতে বাধ্য হবে, নকল চোখের জল।

কেউ কেউ বলছে, আপনি ভোটের জন্য সব করছেন। ভোটের জন্য রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছেন। দেশের মুসলমানদের ভোট পাবেন। রোহিঙ্গারা যদি হিন্দু হতো বা বৌদ্ধ হতো, আপনি কি আশ্রয় দিতেন? খুব সম্ভবত দিতেন না। দেশের ভেতরেই দেশের হিন্দু নাগরিক যখন নির্যাতত হয়, নিজ ভূমি থেকে উচ্ছেদ হয়, যখন ওদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দিয়ে ওদের দেশ ছাড়তে বাধ্য করা হয়, আপনি কি গিয়েছেন ওই নির্যাতিত হিন্দুদের কাছে? এক ফোঁটা চোখের জলও কি ফেলেছেন?

সংখ্যাগরিষ্ঠদের ভোট পাওয়ার জন্য আমাকে আমার দেশে ঢুকতে দিচ্ছেন না, সংখ্যালঘুদের প্রতি সহানূভুতি দেখাচ্ছেন না, ব্লগারদের মৃত্যুতে সমবেদনাও জানাচ্ছেন না। কিন্তু অন্য দেশ থেকে আসা শরণার্থীদের জন্য আপনার আবেগ উপচে পড়ছে। ওরা মুসলমান বলেই, অনেকেই নিশ্চিত, ওরা মুসলমান বলেই। শুধু জিততে চাইছেন। শুধু শাসন করতে চাইছেন। যারা ছলে-বলে কৌশলে শুধু নিজের স্বার্থটাই হাসিল করতে চায়, তাদের আমরা কতটা মুক্তকণ্ঠে মানবতাবাদী বলতে পারি!

ইতি,
আপনি যাকে দু’দশকের বেশি শরণার্থী বানিয়ে রেখেছেন