আইসিসে যোগ দেওয়া শামিমা

আইসিসে যোগ দেওয়া শামিমা

আইসিসে যোগ দেওয়া মানুষের সংখ্যা দেখে আমি সত্যিই অবাক হই। অচেনা ভাষা আর অচেনা সংস্কৃতির অচেনা দেশে, ধুসর মরুভূমিতে, অস্ত্র হাতে নিয়ে ঘুরবে,আর উগ্র সালাফি আদর্শে তৈরি আইসিসে বিশ্বাস-না-করা মানুষদের, সে মুসলিম হোক, অমুসলিম হোক, নৃশংসভাবে গলা কেটে হত্যা করবে, যৌনদাসির সঙ্গে রাত কাটাবে, মানবে না গণতন্ত্র, মানবাধিকার, ধর্ম-নিরপেক্ষতা, মানবে না শরিয়া আইন ছাড়া অন্য কোনও আইন, গুঁড়িয়ে দেবে প্রাচীন সভ্যতা, ত্যাগ করবে স্বজন-বন্ধু– কে চায় এমন ভয়াবহ জীবন? কে আকৃষ্ট হয় এসবে? অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, পৃথিবীর ১১১টি দেশের অন্তত ৪১ হাজার ৪৯০ জন মানুষ এসবে আকৃষ্ট হয়েছে। তারা ইরাকে আর সিরিয়ায় গিয়ে আইসিসে যোগ দিয়েছে। ফ্রান্স, জার্মানি, যুক্তরাজ্যের নাগরিকই যোগ দিয়েছে প্রায় ৬ হাজার। বর্বরতা, নৃশংসতা হয়তো মানুষের রক্তেই। তা না হলে এত মানুষ কেন খুন করার জন্য উন্মাদ হয়েছে! এত লোক কী করে অসম্ভব এক স্বপ্নও দেখে ফেলেছে – পৃথিবীর সব মানুষ রাতারাতি সালাফি বা ওয়াহাবি মুসলমান হয়ে উঠবে, আর পৃথিবীর শাসনভার থাকবে এক খলিফার ওপর!

অসম্ভবকে সম্ভব করার স্বপ্ন অনেকেই দেখে। সব স্বপ্ন তো দোষের নয়। ইউটোপিয়ায় বিশ্বাস করা মানুষ অসম্ভব স্বপ্ন দেখে। তারা কিন্তু বর্বরতায় বিশ্বাস করে না। বর্বরতা আর খুন খারাবির মধ্য দিয়ে যারা নিজেদের স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করতে চায়, তাদের নিয়েই সমস্যা। হিটলারের স্বপ্ন ছিল, স্টালিন, পল পটের ছিল। তাদের স্বপ্ন মানুষকে অকথ্য অত্যাচার, অমানুষিক নির্যাতন আর নির্মম-নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা ছাড়া পূরণ হতো না। এ যুগের মাওবাদীরা মানুষ খুন করছে স্বপ্ন পূরণের জন্য। যাদের খুন করছে তারাও সাধারণ মানুষ। এতে সত্যিই কি মাওবাদিদের কোনও লাভ হচ্ছে? আইসিসও তাই। মানুষ মেরে তারা পৃথিবীকে হাতের মুঠোয় নিতে চায়। এক পাল খুনী আর বর্বর পুরুষ পৃথিবীতে বাস করবে শুধু, মেয়েদের স্বাধীনতা বলে কিছু থাকবে না। মেয়েরা পুরুষের ক্রীতদাসি বা যৌনদাসি হবে। এটি ওদের স্বপ্ন হতে পারে, কিন্তু যে কোনও সুস্থ মানুষের জন্য এ নিশ্চিতই দুঃস্বপ্ন।

আইসিসের পতন নিশ্চিত হওয়ার পর অনেক সন্ত্রাসীই যার যার দেশে ফিরে গেছে। ১৮০০জন সন্ত্রাসী ফিরে গেছে ইউরোপে। অবশ্য এখনও ইরাক ও সিরিয়ায় ১৫/১৬ হাজার সন্ত্রাসি রয়েছে। এরাও একসময় নিশ্চিহ্ন হবে।এটা ঠিক, অনেকে নিজের ভুল বুঝতে পেরেছে, আইসিসের মতো বর্বর দলের সংগে ভেড়াটা যে তাদের উচিত হয়নি,সেটা বোধগম্য হয়েছে অনেকের। আইসিস যে সত্যিকার শান্তির ইসলাম নয়, বরং অশান্তি আর অস্থিরতার ইসলাম, সেটা অনুধাবন করতে পেরেছে। সেটা কিন্তু বাংলাদেশি বংশোদ্ভুত শামিমা বেগমের এখনও বোধগম্য হয়নি, এখনও তার ধর্মের ঘোর কাটেনি। ডাস্টবিনে মানুষের কাটা মুণ্ডু দেখেও যে তার কোনও অনুশোচনা বা অনুতাপ হয়নি, সেটা সে আজও বেশ গর্ব করে বলে। আইসিসের হত্যার রাজনীতি নিয়ে তার কোনও সংশয় নেই, আশংকা নেই। সে বরং মনে করে এটিই সত্যিকারের ইসলাম। তার ভাষ্যে, ইসলাম যদি বলে বিধর্মীদের মুণ্ডু কেটে ফেলা উচিত, তাহলে কেটেই ফেলা উচিত, এতে বিচলিত হওয়ার কিছু নেই। কতটা মগজধোলাই হলে মানুষ এমন অকম্পিত দ্বিধাহীন কণ্ঠে বর্বরতার পক্ষে দাঁড়াতে পারে! শামিমা অনুতপ্ত তো নয়ই, বরং গর্বিত কণ্ঠেই বলেছে, আইসিসে যোগ দিয়ে সে ভুল করেনি। চোখের সামনে দুই সন্তানের মৃত্যু হলো, তারপরও তার একবারও আক্ষেপ হয় না কেন সে সিরিয়া এসেছিল। সে এখনও বিশ্বাস করে আইসিসের আদর্শে, আইসিসের ঘাঁটি যারা বোমা মেরে উড়িয়ে দিয়েছে, দোষ সে তাদেরই দেয়।

যুক্তরাজ্যে তার ফিরে যেতে চাওয়ার একমাত্র কারণ তার পুত্র যেন বেঁচে থাকে, দুই সন্তান হারানোর পর তার এই আকুতি। পুত্রটি তার এবং আইসিসের এক ওলন্দাজ সন্ত্রাসীর সন্তান। উগ্র সালাফি আদর্শে বিশ্বাস করা শামিমা কেন সালাফিদের সৌদি আরবে আশ্রয় চাইছে না, তা আমি বুঝতে পারছি না। এত এত নিরীহ নিরপরাধ অমুসলিম খুন করার পরও, অমুসলিমদের প্রতি তীব্র ঘৃণা প্রকাশ করার পরও বাস করার জন্য তারা সেই অমুসলিমদের দেশকেই বেছে নেয়।কী ভীষণ বৈপরীত্য তাদের কথায় এবং কাজে! যুক্তরাজ্য শামিমার নাগরিকত্ব বাতিল করার পর সে এখন তার স্বামীর দেশ নেদারল্যাণ্ডে যাওয়ার চেষ্টা করবে, নিজেই বলেছে। যদি নেদারল্যান্ডও তাকে অনুমতি না দেয়,তাহলে? তাহলেও কি সে বলবে না আইসিসে যোগ দিয়ে সে ভুল করেছিল? শামিমা তার করুণ পরিণতির জন্য নিজেকে নয় বরং যুক্তরাজ্যকেই দোষ দিচ্ছে, দোষ দিচ্ছে মিত্রশক্তিকে যারা আইসিসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে। আমি কিন্তু দোষ দিই শামিমার মা বাবাকে, যারা ওর মগজে জন্মের পর থেকে ধর্ম ঢুকিয়ে ঢুকিয়ে যুক্তিবুদ্ধি লোপ পাইয়ে দিয়েছে, ওকে ধর্মান্ধ বানিয়েছে। ধর্মান্ধদের মগজ ধর্মের নামে সন্ত্রাস খুব সহজেই মেনে নেয়।

উদারপন্থিরা দাবি করছে ‘শামিমাকে যুক্তরাজ্যে ফিরিয়ে নেওয়া হোক।তার সন্তান তো কোনও দোষ করেনি।তাছাড়া শামিমা সন্ত্রাসী হয়েছে যুক্তরাজ্যে বসেই, এই দায় যুক্তরাজ্যকেই নিতে হবে। ১৫ বছর বয়সের কিশোরী ভুল তো করতেই পারে। তাকে দেশে ফিরিয়ে এনে পুনর্বাসনে রাখা হোক, অথবা তার বিচার হোক, জেল হলে জেল হোক’। ডানপন্থীরা বলছে ‘আইসিসের সব সন্ত্রাসীকে মেরে ফেলা হোক, ওদের বাঁচিয়ে রাখা ঝুঁকির ব্যাপার। তাছাড়া কোনও দেশই তাদের ফেরত নেবে না’। বাংলাদেশের বংশোদ্ভূত হলেও বাংলাদেশ শামিমাকে নেবে না। বাংলাদেশে জঙ্গির অভাব নেই, নতুন জঙ্গিকে জায়গা দেওয়ার জায়গা বাংলাদেশের নেউ। অগত্যা শামিমার কী হবে, তা শামিমা এবং শামিমার শুভাকাংখী যারা আছে, তারা বুঝবে। কেউ কেউ বলে এভাবে সন্ত্রাসীদের নাগরিকত্ব বাতিল করা হলে ওদের ক্ষোভ প্রচণ্ড আকার ধারণ করবে, আগুন আরো জ্বলবে, সন্ত্রাস আরও বাড়বে। কিন্তু অন্যরা কী শিখবে যদি সন্ত্রাসীদের ফিরিয়ে নেওয়া হয়? শিখবে সন্ত্রাসী হওয়ার পরও আরাম আয়েশ বাতিল হয় না। সমস্যায় পড়লে দিব্যি সভ্য দুনিয়ায় ফেরত আসা যায়। দক্ষ সন্ত্রাসী হিসেবে ইউরোপ-আমেরিকায় সন্ত্রাস করার সুযোগও মেলে।

শামিমা যুক্তরাজ্যে ফিরে গেলে, আমার ভয় হয়, সে হয়তো বোরখার আড়ালে বোমা নিয়ে ভিড়ের রাস্তায় বা মেট্রো রেলে যাবে অমুসলিমদের খুন করতে। মগজধোলাই খুব সাংঘাতিক ক্ষতিকর জিনিস। ধোলাই হওয়া মগজকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা প্রায় অসম্ভব। খুব দ্রুত মানুষ নরমপন্থা থেকে চরমপন্থায় চলে যেতে পারে, কিন্তু চরমপন্থা থেকে নরমপন্থায় আসা কারও জন্য সহজ নয়। তাহলে কি চরম ডানপন্থীদের মতো বলবো, সন্ত্রাসীদের বা জিহাদিদের মেরে ফেলো?না, তা বলবো না। সকলেরই বেঁচে থাকার অধিকার আছে। আমি বরং চাইছি শামিমা তার আদর্শে জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বিশ্বাস করতে চাইলে করুক। তবে বিধর্মীদের প্রতি তীব্র ঘৃণা নিয়ে বিধর্মীদের দেশ যুক্তরাজ্যে যাওয়াটা নিরাপদ নয়। এমনকী যুক্তরাজ্যের জেলও শামিমার জন্য নিরাপদ নয়। বিধর্মীদের প্রতি তার মনোভাব যেহেতু জানাজানি হয়ে গেছে, অধিকাংশ বিধর্মীই তাকে অবিশ্বাস করবে, ঘৃণা করবে, এমনকী তাকে ভয়ও পাবে। এসব শামিমাকে প্রতিশোধপরায়ণ করে তুলবে আরও, সে আরও বড় সন্ত্রাসী হয়ে উঠবে। এটা তার জন্য তো ভালো নয়ই, যুক্তরাজ্যের জন্যও ভালো নয়। জিহাদিদের নিজের প্রতি যেমন কোনও মায়া থাকে না, অন্যের প্রতিও থাকে না। কচি কচি তরুণেরা হলি আর্টিজান ক্যাফেতে কী ঠান্ডা মাথায় মানুষের গলা কেটেছে! ওরা কি আগে কখনও মানুষের গলা কেটে হাত পাকিয়েছে? মগজধোলাই সব করিয়ে নিতে পারে, অন্যকে খুন, স্বজন বন্ধুকে খুন, নিজেকে খুন, সব।

শামিমা এবং আরও যারা আইসিস জংগি রাষ্ট্রহীন অবস্থায় ইরাকে বা সিরিয়ায় পড়ে আছে, যারা ইউরোপ আমেরিকার নাগরিকত্ব হারিয়েছে বা হারাতে যাচ্ছে, ইউরোপ বা আমেরিকায় নয়, তাদের চেষ্টা করতে হবে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠের দেশে বাস করার, বিশেষ করে যেসব দেশে শরিয়া আইন বলবত আছে। ওসব দেশেই তারা মনের শান্তি সুখ সব পাবে। বোরখা পরে চলাফেরা করলে ওসব দেশে কেউ টিপ্পনি কাটবে না। ইউরোপের মতো বোরখা নিষিদ্ধ করার আইন জারি হবে না। আর আইসিস পুরুষেরাও নবীজির মতো পোশাক পরে রাস্তা ঘাটে নিশ্চিন্তে ঘুরে বেড়াতে পারবে।কেউ তাদের সন্ত্রাসী ভেবে হামলা করবে না। মুসলিম সমাজের পরিবেশে ওরা সহজে মিশে যেতে পারবে। তাই সকলে মিলে ওদের ইউরোপ আমেরিকায় ফেরত পাঠানোর পরিবর্তে শরিয়া আইনের দেশে ফেরত পাঠানোর চেষ্টা করুন।

আজ ২৪ বছর আমি নির্বাসিত

আজ ২৪ বছর আমি নির্বাসিত

আজ ২৪ বছর আমি নির্বাসিত। দেশে আমাকে প্রবেশ করতে দেয় না দেশের কোনও সরকারই। আমি অবৈধভাবে দেশে প্রবেশ করতে চাই না। আমাদের নির্লজ্জ সরকারেরা কিন্তু অবৈধভাবে আমাকে দেশে প্রবেশে বাধা দিচ্ছে। ২৪ বছর আগে খালেদা জিয়ার সরকার আমাকে দেশের বাইরে বের করে দিয়েছিল কারণ মৌলবাদিরা দেশ জুড়ে তাণ্ডব করছিল। দেশের অবস্থা শান্ত হলে এক দু’মাস পর দেশে ফিরতে পারবো, এরকমই বলা হয়েছিল। ২৪ বছর শেষ হয়েছে, অপেক্ষার সেই এক দু’মাস এখনও শেষ হয়নি, আজও আমাকে আমার নিজের দেশে ফিরতে দেওয়া হয় না। ইতিহাস বলে, পৃথিবীর অনেক প্রতিবাদী লেখক শিল্পীকেই নির্বাসন দিয়েছে বিভিন্ন দেশের সরকার, কিন্তু সরকার বদল হলে সেই লেখক শিল্পীরা ফিরতে পেরেছেন নিজ বাসভূমে। কিন্তু আমার বেলায় সেটিও হয় না। সরকার বদল হয়, আমার ভাগ্য বদল হয় না। আসলে কোনও সরকারই প্রতিবাদী লেখকদের বাক স্বাধীনতায় বা মত প্রকাশের অধিকারে বিশ্বাস করে না, সে কারণেই সমস্যা। পশ্চিমবঙ্গও বাংলাদেশের পদাঙ্ক অনুসরণ করে চলেছে। এক সরকার আমাকে রাজ্য থেকে তাড়িয়েছে, নতুন সরকার এসে আগের সরকারের কিছু না মানলেও আমার নির্বাসনদণ্ড মেনে নিয়েছে। আমার বেলায় নিষেধাজ্ঞাগুলো অদ্ভুতভাবে সংক্রামক। এক সরকার নিষেধাজ্ঞা জারি করলে দেখে দেখে আরেক সরকারও নিষেধাজ্ঞা জারি করে। এক প্রকাশক বই প্রকাশ বন্ধ করলে দেখে দেখে আরেক প্রকাশকও বই প্রকাশ বন্ধ করে। মানুষ ভয়কে জয় করেনি, ভয় মানুষকে জয় করেছে।

দেশে যখন আমাকে ফিরতে দেওয়া হয় না, ইউরোপ থেকে তল্পি তল্পা গুটিয়ে পাড়ি দিয়েছিলাম পশ্চিমবঙ্গে। আমি ইউরোপের নাগরিক, এত দেশ থাকতে পশ্চিমবঙ্গে কেন? এর উত্তরটি সোজা, ভাষাটির জন্য , বাংলা নামের ভাষাটির জন্য– যে ভাষায় আমি গদ্য পদ্য লিখি, সেই ভাষাটি দিনভর শুনবো বলে, সেই ভাষাটি দিনভর বলবো বলে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গও একই আচরণ করলো আমার সঙ্গে। কিছু একটার ছুতো দেখিয়ে আমাকে নির্বাসন দিল। বাংলার পূব আর পশ্চিমকে লোকে আলাদা ভাবে, আমি কিন্তু এর স্বভাব চরিত্র হুবুহু একই দেখি।

দুই বাংলা থেকে নির্বাসিত হয়েও আমি ইউরোপে ফিরি না, আমেরিকায় বাস করি না। বাংলার কাছাকাছি কোথাও পড়ে থাকি। অনেকটা বাড়ির উঠোনে পড়ে থাকার মতো। কেন বাংলার প্রতি আমার এত আকর্ষণ? বাংলার মাটি,হাওয়া, গাছপালা নদীনালা বাড়িঘরের জন্যই কি এমন উতলা আমি? এসব তো অনেক দেশেই আছে—তারপরও কেন কোথাও আমার মন ভরে না! এ নিয়ে আমি প্রচুর ভেবেছি। উত্তর খুঁজেছি বছরের পর বছর। লক্ষ করেছি, বিদেশ বিভুঁইয়ে এই ভাষাটি কোথাও শুনলে আমি থমকে দাঁড়িয়ে ভাষাটি শুনি, এই ভাষাটি কোথাও লেখা আছে দেখলে পড়ে দেখি, এমনকী ছুঁয়েও দেখি। ভাষাটির কাছ থেকে দূরে সরতে আমার মোটেও ইচ্ছে করে না। আমি অনুভব করি আমার মা আমাকে মুখে তুলে খাওয়াচ্ছে, আমার বাবা আমাকে দুহাতে বুকের কাছে টেনে নিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে, অনুভব করি ভাই বোনের সঙ্গে মাঠ জুড়ে হৈ চৈ করে গোল্লাছুট খেলছি। এই অনুভবটি আমাকে সুখ দেয়, অদ্ভুত এক নিরাপত্তা দেয়। এভাবেই ধীরে ধীরে আমি বুঝেছি, আসলে ভৌগলিক কোনও অঞ্চল আমার দেশ নয়, আমার দেশের নাম বাংলাদেশ নয়, আমার দেশের নাম বাংলা ভাষা। ভাষাটিই আমার দেশ। এই ভাষাটি যদি বাংলাদেশে কেউ না বলে, তাহলে ওদেশে ফিরলেও আমার মনে হবে না ও দেশ আমার দেশ।

এই ভাষাটিকে ভালবাসি বলে ভিন্ন ভাষাভাষির অনেক দেশে বাস করেও কোনও দেশের কোনও ভাষাই আমি শিখিনি। এই বাংলার মধ্যেই আমি আমার দেশ, আমার আনন্দ, আমার সর্ব সুখ খুঁজে পাই। মানুষ প্রাচুর্যের জন্য নিজের দেশ ত্যাগ করে উন্নত দেশে পাড়ি দেয়। আর আমি প্রাচুর্যের দেশ ছেড়ে অনুন্নত দেশে পাড়ি দিয়েছি ভাষাটির জন্য। এই ভাষাকে আমি প্রাণের ভেতরে রাখি। আমার আজ মা নেই, বাবা নেই, ভাইয়েরা নেই, প্রিয় অনেক মানুষই আর নেই। এই ভাষাটি আমি যখন উচ্চারণ করি, আমি উচ্চারণ করি আমার মা বাবাকে, আমার ভাইদের, আমার প্রিয় প্রিয় মানুষদের।

যে দেশ তার প্রতিটি মানুষকে অন্ন বস্ত্র বাসস্থান আর শিক্ষা স্বাস্থ্য নিরাপত্তা দিতে পারে না, সেই দেশকে দেশ বলার কোনও অর্থ হয় না। বাংলাদেশটির ভেতর সত্যিই কি কারও নিরাপত্তা আছে, যে কেউ যে কোনও সময় খুন হয়ে যেতে পারে,যে কেউ যে কোনও সময় ধর্ষণের শিকার হতে পারে, কারও হাতে দূর্নীতির অঢেল টাকা, কারও হাত ফাঁকা। একটা ভয়ঙ্কর বৈষম্যের সমাজ! বাঁচতে হলে ক্ষমতাশীলদের চাটুকার হতে হয়। সততা,সহযোগিতা, সমমর্মিতা, সাহসিকতা, সব নির্বাসিত। আমি তাই বাংলাদেশকে আর দেশ বলি না, বাংলা ভাষাটিকে বলি। এই ভাষাটিই আমাকে দেখে দেখে রাখে, ভয়ংকর দুঃসময়ে, ভূতুড়ে অন্ধকারে, আমার হাহাকারের দিনে আমাকে নিরাপত্তা দেয়।

এই ভাষাটি কতদিন পৃথিবীতে টিকে থাকবে আমি সঠিক জানি না। তবে অনুমান করি খুব বেশি শতাব্দি নয়। বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গই বাংলা ভাষার দুটো মূল ভূমি। এই মূল ভূমির পড়ালেখা জানা আধুনিক মানুষই ভাষাটি বলতে আগ্রহী নয়, ভাষাটি নিয়ে তাদের কোনও অহংকার নেই। ভাষাকে না ভালোবাসলে ভাষা টিকে থাকে না। ভাষাকে না ভালোবাসলে ভাষা বলার লোক ক্রমশ কমে যেতে থাকে। যে ভাষায় কথা বলার মানুষ খুব কম, সেই ভাষাগুলো মরে যায়। পৃথিবীতে মোট ৭০৯৯ টি মুখের ভাষা আছে। প্রতি ২ সপ্তাহে ১টি করে ভাষা মরে যাচ্ছে। আমি বুঝি, ইংরেজিতে কথা বললে যদি মনে করা হয় মানুষটি শিক্ষিত, জ্ঞানী, তাহলে লোকে নিজের আঞ্চলিক ভাষায় কথা না বলে ইংরেজিতেই কথা বলার চেষ্টা করবে। তাই বলছে। এই সমস্যা গোটা ভারতীয় উপমহাদেশে। বাংলায়, মারাঠিতে, মালায়ালামে, অসমীয়ায়, উড়িয়ায়, তেলুগুতে, কন্নরে,পাঞ্জাবিতে, রাজস্থানীতে, তামিলে, এমনকী হিন্দিতে কথা বললেও তুমি একটু গেঁয়ো, একটু পিছিয়ে- থাকা, একটু অনাধুনিক, আর ইংরেজিতে কথা বললেই তুমি শিক্ষিত, তুমি জ্ঞানী। এরকম যখন অধিকাংশ মানুষের মানসিকতা, তখন এই মানসিকতা যে সহজে বদল হওয়ার নয়, তা অধিকাংশ মানুষই জানে। জানে বলেই চারদিকে ইংরেজি শেখার হিড়িক পড়েছে। দরিদ্ররা তাদের ছেলেমেয়েদের বাংলা মিডিয়ামের সরকারি স্কুলে পাঠাতো, আর বড়লোকেরা ইংরেজি মিডিয়ামের প্রাইভেট স্কুলে। এই নিয়মটিও উঠে গেছে। এখন দরিদ্ররাও গর্ব করে বলে, ‘ছেলেকে ইংলিশ মিডিয়ামে দিয়েছি’। ইংলিশ মিডিয়ামে ধার কর্জ করে হলেও পড়াচ্ছে, কারণ তাদের ধারণা বাংলা মিডিয়ামে পড়লে কোনও লাভ নেই, কোথাও চাকরি পাবে না। হতদরিদ্র পথের ভিখিরি ছাড়া বাংলা মিডিয়াম অগত্যা কারও জন্য নয়। এই ভাষা মরবে না তো কী করবে?

আমাকে ভারতের জাতীয় টিভিতে সাক্ষাতকার দেবার জন্য খুব ডাকা হয়, আমি না বলে দিই। বলে দিই, আমি ইংরেজি ভালো জানি না। আমাকে যারা ‘ইন্টারন্যাশনাল সেলিব্রিটি’ ভাবে, তারা আকাশ থেকে পড়ে। সেলিব্রিটি হয়েও, ভি আই পি হয়েও, ইন্টেলেকচুয়াল হয়েও ইংরেজি ভালো জানি না, এ তারা বিশ্বাস করতে পারে না। তারা মনে করে বড় হতে গেলে, বুদ্ধিমান হতে গেলে, বিখ্যাত হতে গেলে ইংরেজি জানতেই হয়। আমি তা মনে করি না। কেউ শুধু নিজের ভাষা জেনেই জ্ঞানী, গুণী, বিদ্বান, বুদ্ধিমতি, বিখ্যাত হতে পারে। পৃথিবীর হাজারো কবি লেখক শিল্পী বিজ্ঞানী গবেষক নিজের ভাষা ছাড়া অন্য ভাষা জানতেন না, কিন্তু তাঁরা পৃথিবী-বিখ্যাত। মানুষ তাঁদের লেখা অনুবাদ করে পড়ে।

আমাদের জগত বৈষম্যে ভরা। যে দেশের টাকা বেশি, সে দেশকে বলি উন্নত দেশ। সে দেশের ভাষা শেখার জন্য মানুষের আগ্রহ প্রচন্ড। আমাদের গরিব দেশ, আমাদের দেশের ভাষাও তাই গরিব। গরিব ভাষা শিখতে বা বলতে লিখতে গরিবদেরই আগ্রহ নেই। এই যে বাংলায় বই লিখছি, বহু শতাব্দি পর, ইতিহাসের কবর খুঁড়ে কোনও গবেষক হয়তো আবিষ্কার করবেন বিলুপ্ত ভাষার বই। বাংলার ভবিষ্যতের কথা ভাবলে আমি ওইরকম একটি বেদনাময় চিত্রই দেখি।

মিরোনা : পুরুষকে মানুষ বানাবে

মিরোনা : পুরুষকে মানুষ বানাবে

বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রী নারী, তাই বলে কিন্তু এই নয় যে বাংলাদেশের সব নারীই তাদের স্বাধীনতা এবং প্রাপ্য অধিকার উপভোগ করছে। এখনও দেশের অধিকাংশ নারী, শুধু নারী বলেই, অবহেলিত,অসম্মানিত, অত্যাচারিত, প্রতারিত, নির্যাতিত। নারীকে মূলত অবলা, অসহায়, অক্ষম, অশক্ত প্রাণি হিসেবে বিচার করা হয়। পুরুষতন্ত্র দেশ জুড়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। এমন সময় শুনছি মিরোনা খাতুন নামে বাংলাদেশ নেভির এক জাতীয় দলের খেলোয়াড় ঢাকা সিটি ফুটবল ক্লাবের প্রশিক্ষক হতে যাচ্ছেন। এই ফুটবল ক্লাবটি পুরুষদের। না, মিরোনার চেহারা দেখে কেউ তাঁকে প্রশিক্ষক বানায়নি। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের কোচিং কোর্সগুলো রীতিমত সম্পূর্ণ করে, নিজের যোগ্যতা বার বার প্রমাণ করে তবেই মিরোনা প্রশিক্ষক হওয়ার অনুজ্ঞা পত্র পেয়েছেন, যে অনুজ্ঞা পত্র বা অনুমতি পত্র ফুটবল ক্লাবটির আগের পুরুষ প্রশিক্ষকটিরও ছিল না। মিরোনা বেজায় খুশি। ইতিহাস সৃষ্টি করলেন পুরুষদের ফুটবল দলের প্রথম নারী-প্রশিক্ষক হয়ে। সাক্ষাতকারে বলেছেন, ‘এখন ওরা আমাকে মেনে নিলেই হয়’। ওরা মানে পুরুষেরা। পুরুষদের তো নারীকে গুরু মানার, দলপ্রধান মানার, শিক্ষক মানার, প্রশিক্ষক মানার, প্রভু মানার অভ্যেস নেই।

বাংলাদেশ একা নয়, বেশ কিছু দেশেই পুরুষদের ফুটবল, বাস্কেটবল এবং আরও বিভিন্ন খেলার দলের কোচ নারী। নারীরা সেনাবাহিনীর জেনারেল, এডমিরাল , ফাইটার পাইলট, প্লাটুন কমাণ্ডার , সুপ্রীম কোর্টের বিচারক, রাজ্যের গভর্নর, রাষ্ট্রের মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপ্রধান হতে পারেন, আর ছেলেদের ফুটবল দলের প্রশিক্ষক হতে পারবেন না? নারী নিয়ে সকলেরই অনীহা,অনিচ্ছে, অমনোযোগ, অনাগ্রহ, অভক্তি, অশ্রদ্ধা। তাই নারীকে পুরুষের চেয়ে বেশি পরিশ্রম করতে হয়, পুরুষের চেয়ে নারীকে যোগ্যতার প্রমাণ বেশি দিতে হয়। অনেক দেশে, এমন কী আমেরিকাতেও, নারীকে ফুটবল দলের প্রশিক্ষক হিসেবে অনেক পুরুষই পছন্দ করে না। নারীরা ভালো প্রশিক্ষক হতে পারলেও, যেন-তেন খেলোয়াড়দেরও দক্ষ খেলোয়াড় বানাতে পারলেও, কোথাও যেন অসন্তোষ থেকে যায়। পুরুষ-খেলোয়াড়দের অনেকেই শুধু খেলার কায়দা কানুন জানলেই সুখী নয়, ‘আমি পুরুষ-আমি শ্রেষ্ঠ’ –এই পৌরুষিক অনুভবকেও অন্তরে ধারণ করতে আগ্রহী, সে কারণে নারী-প্রশিক্ষক নয়, পুরুষ-প্রশিক্ষকের প্রয়োজন তাদের, যারা পৌরুষের পতাকা যত্র তত্র ওড়াতে ইন্ধন জোগাবে।

নারীকে এই সমাজ সবার আগে ‘শরীর’ হিসেবে ভাবতে শিখেছে। নারী -প্রশিক্ষকের শরীর নিয়ে বদভ্যেসবশতঃ খেলোয়াড়রা মেতে ওঠে। রূপসী হলে পুরুষ- খেলোয়াড়রা তাঁকে কামনা করে, কুৎসিত হলে ছ্যা ছ্যা করে। তাহলে কি নারীকে রূপসী হওয়াও চলবে না, কুৎসিত হওয়াও চলবে না?মাঝামাঝি কিছু একটা হতে হবে, তা না হলে মুশকিল! এত কিছুর চাপ তো পুরুষ-প্রশিক্ষকের ওপর নেই। তাদের তো প্রশিক্ষণে পারদর্শি হলেই চলে।

অস্বীকার করার উপায় নেই যে আমাদের সমাজ কট্টর পুরুষতান্ত্রিক। এই সমাজ নারীকে পুরুষের অধীন হিসেবে দেখতে অভ্যস্ত। নারী যৌনবস্তু, নারী দাসি, ক্রীতদাসি, নারী পতিতা, নারী অধঃস্তন কর্মচারী, নারী শিক্ষক হলেও বালিকাদের শিক্ষক, নারী ডাক্তার হলেও মহিলা রোগীদের ডাক্তার, নারী নিরীহ, দুর্বল, নারী মা ,বোন, স্ত্রী, প্রেমিকা, নারী কন্যা। নারী ধর্ষণের শিকার, ভায়োলেন্সের শিকার। নারী সম্পর্কে ধারণা অধিকাংশ পুরুষের এমনই। নারী যে সক্ষম, সমর্থ, নারী যে সফল, শক্তিময়ী, পুরুষ যে যে কাজ করতে পারে, তার সবই যে নারীও পারে, নারী যে একাই একশ—এ সম্পর্কে ধারণা মানুষের কম, অথবা ধারণা থাকলেও এ নিয়ে আলোচনা মোটেও ভালো লাগে না। পুরুষকে প্রভুর আসনে বসিয়ে এক কৃত্রিম আমোদ পেতে ভালোবাসে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ পুরুষদের শিখিয়েছে মেয়েদের আদেশ দিতে, উপদেশ দিতে, নিয়ন্ত্রণ করতে, মেয়েদের শিখিয়েছে ওইসব আদেশ উপদেশ মানতে, নিয়ন্ত্রণ মানতে, মুখ বুজে মানতে। মেয়েরা পুরুষদের আদেশ উপদেশ দেওয়ার যোগ্য নয়,নিয়ন্ত্রণ করার যোগ্য নয়—তাও বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে।মেয়েরা যোগ্য নয় কারণ বিশ্বাস করা হয় মেয়েরা পুরুষদের চেয়ে জানে কম, বোঝে কম, পুরুষদের তুলনায় মেয়েদের জ্ঞান কম, মেয়েদের বুদ্ধি কম, মেয়েদের আত্মবিশ্বাস নেই, মেয়েরা ভীতু, ভীরু, হীনমন্য। এমন কুশিক্ষা দিয়ে মগজধোলাই হওয়ার পর কী করে প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষেরা প্রশিক্ষক হিসেবে মেয়েদের মেনে নেবে?

অন্যান্য দেশে সমস্যা হলেও বাংলাদেশে, আশা করছি, নারী-প্রশিক্ষক নিয়ে খুব সমস্যা হবে না।এই জন্য সমস্যা হবে না, যে, মানুষ ইতিমধ্যে নারীকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মেনে নিয়েছে। শুধু মেনেই নেয়নি, প্রধানমন্ত্রীকে রীতিমত ভয় পায়। ভয়ে তাঁর সম্পর্কে কোনও কটু কথা উচ্চারণ তো করেই না, তাঁকে যে খুব সমীহ করে , শ্রদ্ধা করে, তা প্রমাণ করার জন্য তাঁর সামনে মুহুর্মুহু মাথা নোয়ায়। নারীকে নিয়ে হাসাহাসি করতে হবে, কুৎসিত ইঙ্গিত করতে হবে, রসের আলাপ করতে হবে, নারীকে ঠেলা গুঁতো দিতে হবে, নারীকে নোংরা গালি দিতে হবে – এই যে কতগুলো বদ জিনিস পুরুষেরা বিশ্বাস করে, বিশ্বাস করে বলেই চর্চা করতে করতে অভ্যেসে পরিণত করেছে , প্রধানমন্ত্রীর বেলায় সেই অভ্যেসটা তো কিছুটা হলেও দমন করে চলছে।

তাঁকে নিয়ে কোনরকম নোংরামো প্রধানমন্ত্রী পছন্দ করেন না, কোনওরকম নিন্দা সমালোচনা বরদাস্ত করেন না। আশা করলেই আশা পূর্ণ হয় না, তারপরও আশা করছি, প্রধানমন্ত্রী শুধু নিজের নয়, গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল নারীদের ওপর হওয়া পুরুষদের যাবতীয় পৌরুষিক নোংরামো বন্ধ করার চেষ্টা করবেন। যে নারী আজ পুরুষদের ফুটবল ক্লাবের প্রশিক্ষক হলেন, সেই মিরোনা খাতুনকে যেন শুধু নারী হওয়ার কারণে অপদস্থ হতে না হয়। পুরুষ-খেলোয়াড়দের নারী-প্রশিক্ষক যদি দীর্ঘদিন চাকরি টিকিয়ে রাখতে না পারেন, তাহলে হয়তো পুরুষ-খেলোয়াড়দের প্রশিক্ষকের দায়িত্ব আর যাকেই দেওয়া হোক, নারীকে দেওয়া হবে না। নারীর ক্ষমতায়নের সুযোগ নষ্ট হবে, নারীর সমানাধিকার অর্জন বাধাপ্রাপ্ত হবে, পুরুষের নারী-বিদ্বেষ নিয়ন্ত্রণের সব চেষ্টা ভণ্ডুল হবে।

এই বৈষম্যের সমাজে পুরুষকে যেহেতু পুরুষতান্ত্রিক হওয়ার অভ্যেস করানো হয়েছে, মগজধোলাই করানো হয়েছে নারীকে ইতর শ্রেণীর প্রাণী হিসেবে দেখার জন্য —তাই একটি সুস্থ সভ্য সমতার সমাজ তৈরির জন্য নারী – পুরুষ উভয়কেই উদ্যোগ নিতে হবে নারীকে যেন পুরুষদের দলনেত্রী পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। এভাবেই পুরুষের নারী-বিদ্বেষী মানসিকতার পরিবর্তন হবে । নারী শুধু পুরুষদের মা বোন স্ত্রী কন্যা নয়, নারী শুধু হুকুমের দাসী নয়, নারীর কাজ শুধু রান্নাবান্না আর সন্তান উৎপাদন নয়, সন্তান লালন পালন নয়, নারী নেত্রী, নারী শিক্ষক, নারী বিজ্ঞানী, নারী বৈমানিক, নারী গুরু, নারী উপদেষ্টা, নারী প্রশিক্ষক — নারীর আদেশ পুরুষদের মেনে চলতে হবে। নারী-বিরোধী তত্ত্ব যা মুখস্থ করেছে লোকে, তা হাতে-কলমে ভুল প্রমাণ করতে হবে।
সমাজের সর্বস্তরে নারীর বিচরণ চাই। নারীকে শুধু শ্রমিক নয়, মালিকও হতে হবে। প্রধানমন্ত্রী শুধু নিজের, নিজের পরিবার পরিজন আর কাছের লোকদের ক্ষমতায়নের কথা ভাবলে অমর হবেন না। অমর হতে হলে গোটা দেশের অবহেলিত অসম্মানিত অত্যাচারিত নারীর কথা ভাবতে হবে। দেশের সকল নারীকে শিক্ষিত এবং সফল করে তোলার পক্ষে, যোগ্য নারীদের যোগ্য সম্মান দেওয়ার পক্ষে, কর্মস্থলকে নারী-বিদ্বেষমুক্ত রাখার পক্ষে সরকার যদি উদ্যোগ না নেয়, তবে ব্যক্তির উদ্যোগে কি আর অসম্ভবকে সম্ভব করা যাবে? মিরোনাকে দিয়ে ইতিহাস সৃষ্টি হলো। এরকম শত শত মিরোনাকে দেখতে চাই যারা শুধু পুরুষ খেলোয়াড়দের দক্ষ খেলোয়াড় বানাবে না, যারা পুরুষের নারী-বিদ্বেষও দূর করবে, পুরুষকে মানুষ বানাবে।

ভ্যালেন্টাইন ডে

ভ্যালেন্টাইন ডে

ভ্যালেন্টাইন ডে। অদ্ভুত একটা দিন বটে। ছোটবেলায় এরকম দিনের নাম শুনিনি। হঠাৎ যেন উড়ে এসে জুড়ে বসলো। জুড়ে বসে ভালো কাজ যদি করতে পারে করুক। ভ্যালেন্টাইন ডে’র উৎস নিয়ে নানা মুনির নানা মত। সবচেয়ে যেটা গ্রহণযোগ্য, সেটা হলো, লুপারকালিয়া বলে প্রাচীন রোমে এক উৎসব ছিলো, যেটি ফেব্রুয়ারির ১৩ থেকে ১৫ তারিখ অবধি হতো। যে উৎসবে নারী-পুরুষ প্রচুর মদ্যপান করতো, আর সঙ্গমের জন্য সঙ্গী বেছে নিতো। রোমের মানুষ তাদের প্রাচীন ধর্ম ত্যাগ করে খ্রিস্টধর্মে ধর্মান্তরিত হচ্ছিলো যত বেশি, প্রাচীন রোমের দেবীর নামে লুপারকালিয়া উৎসবকে তত তারা মানতে পারছিলো না। উৎসবটি খুব জনপ্রিয় ছিল বলে পুরো ছেড়েও দিতে পারছিলো না। শেষে এমন হলো, উৎসবটি করতে লাগলো, কিন্তু উৎসবটিকে সেইন্ট ভ্যালেন্টাইনের নামে উৎসর্গ করে, তবে। সেই সেইন্ট ভ্যালেন্টাইন, খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করার কারণে রোমের সম্রাট দ্বিতীয় ক্লডিয়াস তৃতীয় শতকে যার গর্দান কেটেছিলেন। ইতিহাসবিদ নোয়েল লেন্সকি বলেছেন লুপারকালিয়া উৎসবে পুরুষেরা দেবী লুপারকাসের উদ্দেশে একটি ছাগল আর একটি কুকুর বলি দিতো। তারপর মৃত ছাগল বা কুকুরের চামড়া দিয়ে উৎসবের মেয়েদের বেদম মারতো। তারা বিশ্বাস করতো, এই মার খেলে মেয়েদের প্রজনন ক্ষমতা বাড়ে। লুপারকালিয়া উৎসব ছিলো সকলের মদ খাওয়ার উৎসব, মদ খেতে খেতে মাতাল হওয়ার উৎসব, মাতাল হতে হতে ন্যাংটো হওয়ার উৎসব, ন্যাংটো হতে হতে লটারির উৎসব, লটারির কৌটো থেকে যে পুরুষ যে মেয়ের নাম ওঠাতো, তার সঙ্গে সেই পুরুষ সঙ্গম করতো সে রাতে। শুধু সে রাতে নয়, ইচ্ছে হলে আরও কিছু রাতে, কেউ কেউ বিয়ে করে নিতো। রোমের মানুষেরা খ্রিস্টান হওয়ার পর ওই উৎসবের নাম যেমন বদলে দিয়েছে, ন্যাংটো শরীরে কাপড়ও পরিয়েছে। পোপ প্রথম জেলাসিয়াস পঞ্চম শতাব্দীতে এটিকে খ্রিস্টানদের ছুটির দিন ঘোষণা করেছিলেন।

মধ্যযুগের ইংরেজ কবি জেফ্রি চশার, আর উইলিয়াম শেকসপিয়ার ভ্যালেন্টাইন ডে’কে রোমান্টিক দিন বলেছেন, এ নিয়ে পদ্য রচনাও করে গেছেন। চশার যদি ভ্যালেন্টাইন ডে’কে রোমান্টিক আখ্যা না দিতেন, যদি কাব্য করে না বলতেন সঙ্গী পছন্দ করার জন্য নানা রঙের পাখি ঝাঁক বেঁধে ছুটে আসত, তাহলে দিনটির সঙ্গে হয়তো ভালোবাসা এসে মিশতো না এমন। ন্যাংটো হয়ে মেয়েদের ওপর নির্যাতন করার ওই প্রাচীন পুরুষতান্ত্রিক উৎসবটিকে ‘রোমান্টিক’ না বলা হলে আমার মনে হয় না দিনটি প্রেমের দিন হিসেবে এভাবে প্রতিষ্ঠিত হতো। যে দুজন ভ্যালেন্টাইন নামের সন্তকে মেরে ফেলা হয়েছিল মধ্য ফেব্রুয়ারিতে, তাঁদের কেউই কিন্তু রোমান্টিক লোক ছিলেন না। রোমের সম্রাট দ্বিতীয় ক্লদিয়াস রোমের সৈন্যদের বিয়ে নিষিদ্ধ করে দিয়েছিলেন, তিনি বিশ্বাস করতেন, জানি না কেন, বিবাহিত পুরুষেরা ভালো সৈন্য হওয়ার উপযুক্ত নয়। রোমের এক পুরোহিত ভ্যালেন্টাইন দাঁড়িয়েছিলেন সম্রাটের নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে, গোপনে বিয়ে করেছিলেন তিনি, সৈন্যদের বিয়েও দিয়েছিলেন। ১৪ ফেব্রুয়ারিতে তাঁর গর্দান কাটা যায়, গর্দান কাটার আগে নাকি জেলারের মেয়ের প্রেমে পড়েন তিনি, একটি চিঠির শেষ ছত্রে লিখেছিলেন, ফ্রম ইয়র ভ্যালেন্টাইন।

আজ একবিংশ শতাব্দীতেও সেই ভ্যালেন্টাইনের নামে দিবস পালন হচ্ছে। তবে দিবসটি এখন ব্যবসায়ীদের জন্য বিশাল দিন। আমেরিকায় এ বছর ১৮.২ বিলিয়ন ডলারের ভ্যালেন্টাইন ডে’র উপহার ক্যান্ডি, ফুল, কার্ড আর ডিনার বিক্রি হয়েছে। গত বছর হয়েছিল ১৭.৬ বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা।

ভ্যালেন্টাইন ডে’র বিপক্ষে হিন্দু এবং মুসলমান মৌলবাদীরা বেশ সরব। তারা মনে করে এই দিবসটি আমাদের সংস্কৃতিবিরোধী। আশ্চর্য, প্রেম কি সংস্কৃতির অংশ নয়? যে সংস্কৃতিতে প্রেম নেই, সেই সংস্কৃতি অপসংস্কৃতি। যারা প্রেম দিবসের বিরুদ্ধে মিছিল করে, তারা কি কখনও ধর্ষণের বিরুদ্ধে, ঘৃণা আর বর্বরতার বিরুদ্ধে মিছিল করেছে? নিশ্চিতই করেনি।

ভ্যালেন্টাইন ডে’র উৎস যত কুৎসিতই হোক, যত বর্বরই হোক, যত উদ্ভট হোক, দিনটি নিয়ে ব্যবসায়ীরা যত ব্যবসা করুক না কেন, দিনটির সঙ্গে ভালোবাসা জড়িয়ে আছে, ভালোবাসাটা জেফ্রি চশারের কারণেই জড়াক, জড়িয়েছে তো! মানুষ তো ইতিহাস জানে না, সে কারণেই দিনটিকে নিখাদ ভালোবাসার দিন হিসেবেই বিচার করছে। না হয় করুক। চারদিকে যখন ঘৃণা আর অবিশ্বাস, চারদিকে যখন স্বার্থপরতা আর হিংসে, চারদিকে যখন যুদ্ধ আর অশান্তি— তখন কোনও এক নামে কোনও এক দিবস যদি আসে, যে দিবস মানুষের সঙ্গে মানুষের ভালোবাসা-স্নেহ-শ্রদ্ধার সম্পর্ক স্থাপন করতে চায়, এর চেয়ে সুখবর আর কী আছে পৃথিবীতে? মানুষ জন্মেই শিখে যাচ্ছে কী করে নিজের জন্য সব নিতে হয়, ছলে বলে কৌশলে মানুষ শুধু নিতে শিখে যায়, কিন্তু দিতে শেখে না, দিতে কেউ কাউকে শেখায় না, ভ্যালেন্টাইন নামের দিনটি এসে যদি শেখায়, ক্ষতি কী? ৩৬৫ দিনের মধ্যে ৩৬৪ দিনই তো হিংসে বিদ্বেষ নিয়ে আছে, বছরের একটি দিনও যেন ভালোবাসা নিয়ে থাকে।

দিনটি যদি ব্যবসায়ীদের হাত থেকে মুক্তি পেতো, সবচেয়ে ভালো হতো। কিন্তু আপাতত মুক্তি পাওয়ার কোনও সম্ভাবনা নেই। ব্যবসায়ীরা দিবসটির নামে ব্যবসা করে নিচ্ছে বলে গোটা দিবসটিকে উড়িয়ে দেওয়া ঠিক নয়। তার চেয়ে দিবসটিকে আর কী কী উপায়ে সুন্দর এবং সমৃদ্ধ করা যায়, সে বিষয়ে আমাদের ভাবতে হবে। দিবসটির বিবর্তন সেই আদিকাল থেকে হচ্ছে। আজ মানুষ শুধু প্রেমিক-প্রেমিকাকে নয়, বাবা মা ভাই বন্ধু এবং পোষা কুকুর বেড়ালকেও হ্যাপি ভ্যালেন্টাইন জানাচ্ছে। পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা প্রদর্শন করার আর তো সময় সুযোগ নেই কারোর। যদিও আমি মনে করি, ভালোবাসা এক দিনের জন্য নয়, ভালোবাসা নিত্যদিনের জন্য, যদিও আমি ব্যক্তিগতভাবে ভ্যালেন্টাইন ডে উদযাপন করি না, কিন্তু সমাজটা যেহেতু স্বার্থান্ধ, এই সমাজটাকে চাই ভালোবাসা শিখুক, ভালোবাসার চর্চা করুক। ঘৃণা প্রদর্শন নিয়ে জড়তা নেই, কিন্তু ভালোবাসা নিয়ে যেহেতু জড়তা আছে, চাই আনুষ্ঠানিকভাবে মানুষের জন্য মানুষ ভালোবাসা প্রকাশ করুক। মানুষ প্রকাশ্যে মানুষকে চড় নয়, কিল নয়, লাথি নয়, বরং চুমু খাক। একটি দিন ভালোবাসার চর্চা করলে মানুষ প্রকাশ্যে প্রেম করাকে আর চুমু খাওয়াকে মন্দ বলে ভাববে না, নিষিদ্ধ বলে ভয় পাবে না, মানুষের দ্বিধা কেটে যাক। আজ এই দিনে ভায়োলেন্স নিষিদ্ধ হোক।

নারীর ওপর নির্যাতন অন্তত একটি দিনের জন্য বন্ধ করবে কি পুরুষ? ভায়োলেন্স অন্তত বছরের একটি দিনে না করুক পুরুষ। ভ্যালেন্টাইন দিবসে যদি ভায়োলেন্স বন্ধ না হয়, তা হলে কোনও মানে নেই এই ভ্যালেন্টাইন দিবসের। তুমি ভালোবাসতে না পারো, অন্তত ঘৃণা করো না। তুমি ফুল দিতে না পারো, অন্তত কাঁটা দিও না। তুমি চুমু খেতে না পারো, অন্তত চড় মেরো না। ভায়োলেন্স বন্ধ না করলে ভ্যালেন্টাইন দিবস পালন করার অধিকারই হয়তো পুরুষের থাকা উচিত নয়! ভ্যালেন্টাইন ডে’তে যেন একটি মেয়েকেও যৌন দাসী হতে না হয়, একটি মেয়েকেও যেন পুরুষের নির্যাতন সইতে না হয়, একটি মেয়েকেও যেন মেয়ে হয়ে জন্ম নেওয়ার কারণে শিক্ষা, স্বাস্থ্য আর স্বনির্ভরতার সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হতে হয়। রাজি?

ডাক্তার মিতুর ফাঁসির দাবিতে পুরুষতন্ত্র

ডাক্তার মিতুর ফাঁসির দাবিতে পুরুষতন্ত্র

ডাক্তার মিতুর ফাঁসির দাবিতে বাংলাদেশের ডাক্তাররা বিশাল বিশাল ব্যানার হাতে রাস্তায় নেমেছে। মিতুর ফাঁসি দাবি করছে তারা, কারণ মিতুর স্বামী, আকাশ, সেও ডাক্তার, আত্মহত্যা করেছে। মিতু তার স্বামীকে হত্যা করেছে এই প্রমাণ পাওয়া গেলে মিতুর ফাঁসি দাবি যদি করা হতো, বুঝতাম বাংলাদেশের মানুষ এখনও চোখের বদলে চোখ চায়। কিন্তু যতদূর জানি মিতু তার স্বামীকে হত্যা করেনি, অথচ তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে মানুষ। তাহলে বাংলাদেশের মানুষ কী চায়? আত্মহত্যার বদলে হত্যা? মিতুর অপরাধ, আকাশের সঙ্গে বিয়ের আগে এবং পরে সে অন্য পুরুষের সঙ্গে প্রেম করেছে, শুধু প্রেম নয়, রীতিমত যৌন সম্পর্ক করেছে। এ কারণে আকাশ বড় অসন্তুষ্ট ছিল। শুধু অসন্তুষ্ট বলবো না, রেগে আগুন হয়ে ছিল। এসময় আকাশ যদি মিতুকে খুন করতো, তাহলে কিন্তু লোকে বলতো, অমন বিশ্বাসঘাতিনী পাপিষ্ঠাকে, অমন বেশ্যাকে খুন করেছে, বেশ করেছে। কিন্তু মিতুকে খুন না করে নিজেকেই খুন করে ফেলেছে আকাশ। গলায় দড়ি দেয়নি, আর্সেনিক খায়নি, যেগুলোয় যন্ত্রণা হয়, বরং ইঞ্জেকশান নিয়েছে রক্তে, খুব সম্ভবত বেশি মাত্রার ঘুমের ওষুধ নিয়েছে, কোনও যন্ত্রণা যেন টের না পায়। অপারেশন টেবিলে অজ্ঞান করার সময় যে রকম ধীরে ধীরে ঘুমিয়ে যায় মানুষ, তেমন করে ঘুমিয়ে গেছে। মৃত্যু যন্ত্রণায় ভোগেনি আকাশ। কিন্তু মিতু যেন সারাজীবন ভোগে, সেই ব্যবস্থা পাকা করে গিয়েছে। মিতুর ব্যক্তিগত মেসেজগুলো, যেমন ‘পরপুরুষ’-এর সংগে তার যৌন রসাত্মক কথাবার্তা , পরপুরুষের সঙ্গে তার অর্ধ উলঙ্গ ছবি, সবই পাবলিক করে দিয়েছে আকাশ। জানিয়ে দিয়েছে মিতু খারাপ, মিতু নষ্ট । মেরে ধরে হলেও মিতুকে দিয়ে স্বীকার করিয়ে নিয়েছে যে মিতু দুশ্চরিত্র, ব্যাভিচারী। এইসব স্বীকারোক্তির ভিডিও বাজারে ছেড়ে তবেই মরেছে আকাশ। দুঃখে কষ্টে যন্ত্রণায় কাঁদতে কাঁদতে মরেনি। হাহাকার করতে করতে, কুঁকড়ে যেতে যেতে মরেনি। ওগুলো করলে মিতুর পরকীয়ার প্রমাণ সংগ্রহ করে ফেসবুকে সেগুলো প্রকাশ করতো না, মিতুর বিরুদ্ধে বিষোদগার করতো না, মিতুর সর্বনাশ করার কূটকৌশল করতো না। মিতুকে ভালোবেসে জীবন উৎসর্গ করেনি আকাশ। ভালোবেসে মানুষ যেমন সহায় সম্পত্তি দিয়ে থুয়ে যায়, তেমন কিছুই দিয়ে থুয়ে যায়নি, বরং মিতুর পাওনা দেনমোহরের ৩৪ লাখ টাকা শোধ না করেই মরেছে। মিতু যেন মানুষের ঘৃণা পেতে পেতে, রাস্তা ঘাটে লোকের ঢিল খেতে খেতে, গালি খেতে খেতে, ঘরে বাইরে লাথি খেতে খেতে মরে। অসম্মান পেতে পেতে, অপমানিত হতে হতে যেন মরে। শান্তি বলে কিছু যেন মিতুর না জোটে। আকাশ কাঁচা কাজ করেনি। অনেকটা সেইসব বর্বর প্রতিশোধপরায়ণ লোকের মতো আকাশ, যারা বলে তোকে না মেরে মরবো না, আমাকে শান্তি দিসনি, তোকেও শান্তি দেবো না।

আমি ফেসবুকে শুধু লিখেছি আত্মহত্যা করা মানেই তুমি নিরীহ এবং নির্দোষ – তা নয়। তাতেই আমাকে অকথ্য ভাষায় গালাগালি করছে পুরুষতন্ত্রের নোংরা কাদায় ডোবা অন্ধ, অসভ্য, অশিক্ষিত নারীবিদ্বেষী নারীপুরুষ। তাদের ভাষ্য মিতু বেশ্যা, মিতুকে যেহেতু বেশ্যা বলে আমি গালি দিইনি, আমিও বেশ্যা। বেশ্যা শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো, ‘যে স্ত্রীলোক যৌন সহবাসের বিনিময়ে অর্থ উপার্জন করে’। দুর্মুখেরা বেশ্যা শব্দের অর্থও জানে না। মিতু ডাক্তার মেয়ে, সচ্ছল এবং স্বনির্ভর, সে অর্থ উপার্জন করে রোগীর চিকিৎসার বিনিময়ে , রাস্তার যে কোনও লোকের সঙ্গে যৌন সহবাসের বিনিময়ে নয়। সে প্রেমিকের সঙ্গে যৌন সহবাস করে, শুধু যৌন-আনন্দ দেবার জন্য নয়, নেবার জন্যও করে। বেশ্যাদের সম্পূর্ণ উল্টো।

আকাশ ঠিক ঠিক জানতো কী করলে মিতুকে বিশ্বাসঘাতকতার শাস্তি দেওয়া যায়। আকাশ যদি মিতুকে হত্যা করতো, তাহলে আকাশকে শাস্তি পেতে হতো। আকাশ জানতো সে নিজেকে হত্যা করলেই মিতু শাস্তি পাবে, যতদিন বেঁচে থাকে ততদিন শাস্তি পাবে। আমার মনে হয় না বাংলাদেশে মিতুর বেঁচে থাকা সম্ভব হবে, ধর্মীয় সন্ত্রাসীরা যেমন ধর্মে অবিশ্বাসীদের পেলে কুপিয়ে মারে, তেমন পুরুষতন্ত্রের পূজারীরা পুরুষতন্ত্রে অবিশ্বাসীদের কুপিয়ে মারবে। মিতু যা করেছে, তা পুরুষতন্ত্রের বুকে ছুরি মারা ছাড়া কিছু নয়। স্বামী পরনারীর সঙ্গে যৌন সম্পর্ক করলেও, দাসির সঙ্গে, এমনকী ক্রীতদাসীর সঙ্গেও– কারো কোনও আপত্তি নেই, কারণ ধর্ম যেমন একে অনুমোদন দেয়, পুরুষতন্ত্রও দেয়। যুগে যুগে পুরুষেরা ঘরে বাইরে সর্বত্র নারীকে ভোগ করে এসেছে। তাদের জন্য শুধু প্রাচীন কালেই নয়, এ যুগেও বেশ্যালয় গড়ে দেওয়া হয়, যেন সেসব বেশ্যালয়ে গিয়ে লক্ষ লক্ষ অচেনা অজানা অসহায় মেয়েদের ধর্ষণ করতে পারে বা ভদ্র ভাষায় যৌন সম্পর্ক করতে পারে। মেয়েদের জন্য শুধু স্বামীর সঙ্গে যৌন সম্পর্ক বৈধ করেছে ধর্ম এবং পুরুষতন্ত্র।

মিতু সম্ভবত পুরুষদের অনুকরণ করেছে । পুরুষদের পরনারীগমন দেখে দেখে নিজেও করেছে পরপুরুষগমন। পুরুষ এই সমাজের প্রভু। প্রভুর কাছ থেকেই তার অধঃস্তনরা শেখে। মিতু ভুলে গিয়েছিল, এই সমাজে যা পুরুষের জন্য নৈতিক, তা মেয়েদের জন্য নৈতিক নয়। ধরা যাক আকাশ যৌনতায় অক্ষম, বা অপারদর্শী পুরুষ। সে কারণে মিতু সক্ষম এবং পারদর্শী পুরুষের সঙ্গে সম্পর্ক করেছে। এর যদি ঠিক উল্টোটা হয়, স্ত্রী যৌন সম্পর্কে অক্ষম, তাহলে কিন্তু পুরুষের পরনারীগমনকে সকলে স্বাভাবিক মনে করবে। কিন্তু স্বামী অক্ষম হলেও নারীর পরপুরুষগমনকে একটি প্রাণিও সহ্য করবে না।

সবচেয়ে ভালো হতো আকাশ এবং মিতুর যদি তালাক হয়ে যেত। ভালোবাসাহীন সংসারে তালাকের মতো জরুরি আর কিছু নেই। কিন্তু যে কোনও কারণেই হোক, তালাক তখনও হয়নি। আকাশ বেঁচে থাকলে হয়তো তালাক আজ না হোক কাল হতোই। জানিনা কী ধরণের চুক্তি আকাশ এবং মিতু করেছিল। কিছু দম্পতির মধ্যে কিন্তু এমন চুক্তি হয় যে, যে কেউ বাইরে যে কারও সঙ্গে প্রেম করবে, শোবে, কিন্তু বিয়েটা ভাঙবে না। নিজেদের যৌন সম্পর্ক একঘেয়ে লাগলে কিছু দম্পতি আরেকজন যৌন সংগী ভাড়া করে এনে থ্রিসাম করে। সুতরাং একগামিতা যে সব দম্পতির কাম্য, তা নয়। আকাশের রাগ দেখে ধারণা করতে পারি তাদের চুক্তি ছিল পরস্পরের প্রতি বিশ্বস্ত থাকার, একগামি থাকার। তাহলে দ্বিচারিতা করাটা মিতুর উচিত হয়নি। এরকম অনুচিত অনৈতিক কাজ পুরুষেরা করে বলেই কি মেয়েদের করতে হবে?

মিতুকে জেলে পাঠানো হয়েছে। মিতুর জন্য জেলও এখন আর নিরাপদ নয়। থানায়, রিমান্ডে, আদালতে, জেলে — সবখানেই মিতুর জীবন ঝুঁকিপূর্ণ। নারীবিদ্বেষী খুনীদের যে কেউ তাকে খুন করতে পারে, এমনকী পুলিশও পারে। পুলিশও তো আমাদের সমাজের লোকই, যে ডাক্তাররা মিতুর ফাঁসির দাবিতে আন্দোলন করছে, যে লোকেরা মিতুকে পায়ের তলায় পিষতে চাইছে, যে লোকেরা তাকে বেশ্যা বলে ছিঃছিঃ ছুঁড়ছে, তাদের মানসিকতা তো পুলিশের মানসিকতা থেকে পৃথক নয়।

কাউকে আত্মহত্যায় প্ররোচিত করার বিরুদ্ধে বাংলাদেশে আইন আছে একটি। এই আইনটি এ পর্যন্ত কটা পুরুষের বিরুদ্ধে প্রয়োগ করা হয়েছে জানা নেই, তবে মেয়েদের বিরুদ্ধে প্রয়োগ হলে আমি অবাক হবো না। নারীবিদ্বেষী সমাজে এমন চিত্রই স্বাভাবিক। বাংলাদেশে প্রতিদিন মেয়েরা স্বামী বা প্রেমিকের অত্যাচারে আত্মহত্যা করছে, অথবা স্বামী বা প্রেমিক দ্বারা খুন হচ্ছে। প্রতিদিন মেয়েরা, শিশু থেকে বৃদ্ধা অবধি ধর্ষণের, গণধর্ষণের শিকার হচ্ছে। প্রতিদিন মেয়েরা পুরুষের বর্বরতা, বৈষম্য, শিশু পাচার, যৌন হেনস্থা, গার্হস্থ্য হিংসে– ইত্যাদি হাজারো সমস্যায় ভুগছে। দেশে কত শত মেয়ে স্বামীর পরস্ত্রীগমন, পরকীয়া, প্রতারণা দেখছে, কত শত মেয়ে স্বামীর অবহেলা, অবজ্ঞা, অপমান সইছে, কত শত মেয়ে গলায় দড়ি দিচ্ছে। তাতে ক’টা মানুষ স্বামীদের হেনস্থা করছে? বরং স্বামীরা কিছুদিন পর বুক ফুলিয়ে নতুন একটা বিয়ে করছে, নতুন বউ ঘরে আনছে। আজ মিতু পুরুষ হলে, মিতুর কোনও অসুবিধে হতো না, মিতুকে জেলেও যেতে হতো না, মিতুর ফাঁসির দাবিও কেউ করতো না।

আকাশ আত্মহত্যা করেছে। আত্মহত্যা করলেই সে মানুষ নিরীহ, নির্দোষ, নিরপরাধ– এমন ভাবার কোনও যুক্তি নেই। মাথায় অসুখ থাকলে অনেকে আত্মহত্যা করে। রাগে জেদে হিংসেয় ঘৃণায় হিতাহিত জ্ঞান হারিয়েও কেউ কেউ আত্মহত্যা করে। কাউকে অত্যাচার নির্যাতন ক’রে, খুন ক’রে, পালানোর পথ না পেয়ে শাস্তির ভয়ে বা গ্লানিতেও আত্মহত্যা করার নজির আছে। স্ত্রী তাকে ঠকিয়েছে বলে কেউ যদি আত্মহত্যা করে, এর মানে কিন্তু এই নয় যে সে তার স্ত্রীকে খুব ভালোবাসতো। আত্মগৌরব অনেক সময় এত অতিকায় হয়ে ওঠে, এতে চির ধরলে কিছু কিছু মানুষ আত্মহননের পথ বেছে নিতে দ্বিধা করে না। আকাশের হাত হয়তো নিশপিশ করছিল মিতুকে আর মিতুর প্রেমিকদের খুন করতে, কিন্তু দেশ সুদ্ধ লোক জানবে সে খুনী,দেশ সুদ্ধ লোক দেখবে তার ফাঁসি হচ্ছে, বা তাকে জেলের ভাত খেতে হচ্ছে যাবজ্জীবন ! এটিই সহ্য হয়নি। খুন করতে না পারার এই অক্ষমতাও মানুষকে আত্মহত্যা করতে ইন্ধন দেয়। যাকে আমি আমার অধীন রাখতে চেয়েছি — আমার চেয়ে ক্ষুদ্র,আমার চেয়ে তুচ্ছ, আমার চেয়ে মূর্খ না হয়ে যদি সে আমার হাতের মুঠো থেকে বেরিয়ে আমাকেই টেক্কা দেয়, বা আমাকে অবজ্ঞা করে, তাহলে এ জীবন রাখার কোনও মানে নেই। ঈর্ষা ভয়ঙ্কর হয় উঠলে কী করে মানুষ? হয় হত্যা নয় আত্মহত্যা। কেউ একজন আত্মহত্যা করেছে, সুতরাং সে খুব সৎ ছিল, সরল ছিল, মহান ছিল, মহামানব ছিল – এই ধারণাটি মস্ত ভুল ধারণা।

কুখ্যাত খুনী হিটলার আত্মহত্যা করেছিল। বহু খুনী , সন্ত্রাসী, আপরাধীই আত্মহত্যা করেছে। বিশ্বাস না হয়, ইতিহাস ঘেঁটে দেখুন। আজকাল তো ইতিহাস কেউ ঘাঁটে না। সহজ উপায় বলে দিই, গুগুল করুন, মারডারারস হু কমিটেড সুইসাইড, অথবা ক্রিমিনালস হু কমিটেড সুইসাইড। দেখুন লিস্ট কত দীর্ঘ।